শুটিংয়ের মতোই থমকে যাচ্ছে না তো আরচারি!

শুটিংয়ের পথেই কী হাঁটছে আরচারি? একসময় শুটিং ছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পদক ও গৌরবের প্রতীক, যা সুশাসন ও অব্যবস্থাপনায় আজ ধ্বংসস্তূপের শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে। একইভাবে আরচারিও সোনা-রুপার ঝলকে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখিয়ে আবার গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিল কি না! আরচারদের ওপর যে আশা ছিল, সেটিও টুঁটে গেছে এশিয়ান গেমসে।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুটিং হয়ে উঠেছিল সোনার খনি। ১৯৯০ কমনওয়েলথ গেমসে আতিকুর রহমান ও আব্দুস সাত্তার নিনির জুটি ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে সোনা জয়ের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন বিশ্বমঞ্চে। এরপর ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হোসেন খান চমকে দিয়ে সোনা জিতেছিলেন। দুই বছর বাদে আসিফ ও শারমিন আক্তার পাকিস্তান সাফ গেমস মাতিয়েছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা উড়িয়ে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে আবদুল্লাহ হেল বাকী ও শাকিল আহমেদ দুটি রুপা জিতে শুটিংয়ের দিগন্ত প্রসারিত করেছিলেন গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে। সময়ের আবর্তে সেই পদকের ধারায় ছেদ পড়েছে। গুটিয়ে গেছে স্বপ্নের ডানা স্রেফ সাংগঠনিক ব্যর্থতায়।
এখন আর শুটিং নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় না। বিশেষ আলোচ্য হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের আরচারি। অবশ্যই সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকীর মতো কয়েকজন আরচারের সৌজন্যে। এমন বেশ কয়েকজন আরচার মিলেই বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন কয়েক বছর আগে। এখন তারা নেই, তবে প্রজান্মান্তরে সাফল্যের মশাল থাকার কথা ছিল নতুনদের হাতে। সেটা থাকেনি। এশিয়ান গেমস যেন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করে দিয়েছে খেলাটিকে। দলগত ও ব্যক্তিগত— কোনো ইভেন্টে নেই কোনো অর্জন। আরচাররাও ঝাঁকের কই হয়ে মিশে গেছেন ব্যর্থতার মিছিলে।
অথচ গেমসে যাওয়ার সময় স্বপ্নের কথা বলে গিয়েছিলেন কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। তার আশা ছিল, গত কয়েক মাসের ভালো প্রস্তুতির ফল পাওয়া যাবে জাপানে। কিন্তু একরাশ হতাশা নিয়ে এই জার্মান কোচ বলছেন, ‘এটা আমাদের জন্য খুব বাজে অভিজ্ঞতা। আপনি দেখবেন, আমাদের চেয়ে যারা আগে পিছিয়ে ছিল তারাও ভালো করেছে এখানে এসে। আর আমাদের ছেলেমেয়েরা ট্রেনিংয়ে যা মারত, সেটার ধারেকাছে ছিল না এখানে। আসল জায়গায় পারফর্ম করতে না পারলে অত ভালো ট্রেনিং করে লাভ নেই।’
তবে অনেকের ধারণা, ফেডারেশনে অস্থিরতায় আরচারদের মনোযোগ নষ্ট হয়েছিল গত দুই বছর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমিটি বদলে এমন কিছু মানুষের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের ছিল না কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা। অগোছালো ও দিগভ্রান্ত কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল আরচারদের ওপর। এ রকম সাংগঠনিক ব্যর্থতা ও দুর্বলতার বলি হয়েছিল শুটিং। তাদের সমস্যা শুরু হয়েছিল পাঁচ-ছয় বছর আগে থেকে। তারা আজও ধুঁকছে, পরিকল্পনা ও সঠিক কাঠামোর অভাবে এই খেলাটি হারিয়েছে ঐতিহ্য।
সেই বিপথগামিতাই কি লেখা আছে আরচারির ভাগ্যে? আরচারি ফেডারেশনের সভাপতি কাজী রাজীব উদ্দীন চপল শুটিংয়ের সঙ্গে আরচারিকে মেলাতে চান না, ‘শুটিং কেন পিছিয়েছে, সেটা আমি বলতে পারব না। তবে আরচারি পদক না পাওয়ার পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ আছে। গত দুই বছরে কাজের কিছু ব্যত্যয় হয়েছে অবশ্যই। কাউকে দোষারোপ করছি না। আরচারির লড়াইয়ে আমরা দু-এক পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলাম। সেটি উতরানোর উপায় নিয়ে কোচের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আশা করি, নতুন পরিকল্পনা করে এগোলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি জোর দিয়ে বলছি, আরচারি কখনো শুটিং হবে না।’
চপলের হাত ধরেই আরচারি শুরু বাংলাদেশে। মাঝে দুই বছর তিনি ফেডারেশনে চালকের আসনে ছিলেন না। এখন আন্তর্জাতিক আরচারি ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি নতুন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, কিছু জিনিসে বদল আনতে হবে। পরিবর্তনের জন্য অনেক দূরে যেতে হবে না। ভুটান কীভাবে ভালো করছে, সেটা দেখলেও হয়ে যায়। জাপান থেকে ফিরে গিয়েই দেখবেন আরচারিতে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে।’



