সর্বপ্রাণ ও সর্বজনের প্রতি দায়িত্বশীল ও দরদি হতে হবে

জলবায়ু সংকটের কুফল আমাদের মতো দেশগুলো এরই মধ্যে টের পাচ্ছি। আমাদের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। জলবায়ুসহিষ্ণু খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য অ্যাগ্রোইকোলজিকে নীতি হিসেবে নেওয়া এখন সময়ের চাহিদা। দায়িত্বশীল জলবায়ু-কূটনীতির জন্য এখনই পদক্ষেপ না নিলে আমাদের ভূগতে হবে
২০৫০ সালে বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি কেমন হবে? এ প্রশ্ন নিছক ‘নিরপেক্ষ’ নয়। এ পরিস্থিতি কার চোখে এবং কীভাবে দেখা হবে সেই আলাপটি জরুরি। কার্বন-ঋণাত্মক, কার্বন-নিরপেক্ষ, কার্বন-কারবারি বা অতি কার্বন ব্যবহারকারী সবার জলবায়ু-চিন্তা কোনোভাবেই একরকম নয়। তাই এই দেখা না দেখা মূলত নির্ভর করবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যে জলবায়ু অবিচারের ময়দানে টিকে থাকার লড়াই করছে, সেই ভিন্ন ভিন্ন বহুমুখী জটিল অভিজ্ঞতার ওপর। কারণ, দুনিয়া জুড়ে জারি থাকা জলবায়ু জিজ্ঞাসা নির্দয়ভাবে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশ্ব নেতৃত্ব বিগত সব জলবায়ু-অঙ্গীকার বরখেলাপ করে নির্দয় কার্বন চাদরে ঢাকছেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। অতিকায় জীবাশ্ম-জ্বালানিনির্ভর ও যুদ্ধ-আক্রান্ত এ সময়ে দাঁড়িয়ে ২০৫০ সালের জলবায়ু-দুনিয়াকে আন্দাজ করা কঠিন। জারি থাকা অমীমাংসিত জিজ্ঞাসা, ন্যায্যতা আর আকাঙ্ক্ষার তল থেকে চলতি আলাপ এক অমানুষকেন্দ্রিক (নন-অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক) আন্দাজের সাহস করছে।
প্রতিটি প্রাণ ও বাস্তুতন্ত্রের আইনি অধিকার
২০৫০ নিশ্চয়ই কোনো ‘টাইমমেশিন’ বা ‘আলাদিনের চেরাগে’ করে আসবে না। পাড়ি দিতে হবে আরও পঁচিশ বছর। এই দীর্ঘযাত্রায় আবহাওয়ার গড় ফলাফল কেমন হবে, তা আন্দাজ করা কঠিন। প্রাতিষ্ঠানিক ও লোকায়ত জ্ঞান কিছু গাণিতিক পূর্বাভাস দিতে পারে। কিন্তু সবকিছু নির্ভর করে ২০৫০ সালে যাওয়ার আগে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থা, জ্বালানি রূপান্তর, সামাজিক সংকট, বিশ্ব নেতৃত্বের অঙ্গীকার, ক্ষমতার রাজনীতি ও নাগরিক তৎপরতাগুলো কেমন হবে তার ওপর।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রতি বছর এ প্রতিবেদন জমা দিলেও দেখা গেছে অধিক কার্বন দূষণকারী দেশ যেমন আমেরিকা, চীন এ প্রতিবেদন জমা দেয় না
বরাবরের মতো প্রত্যাশা থাকবে অণুজীব থেকে শুরু করে বৈলাম বা বটগাছ, মৌমাছি থেকে শুরু করে হাতি, জঙ্গল থেকে জলাভূমি সবার জীবন নিরাপদ হবে। মানুষ নিজের খাদ্য উৎপাদন বা বসতি স্থান কিংবা বিনোদনের নামে বন্যপ্রাণীর বসত দখল করবে না। বাংলাদেশে হাইকোর্ট নদীর ব্যক্তি আইন অধিকার ঘোষণা করেছেন। আশা থাকবে সব প্রাণ-প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্রের আইনি অধিকার সংবিধানে যুক্ত হবে। দেশের বিল, চর, গড়, বন, উপকূল, সমতল, পাহাড়, টিলা, গিরিখাদ, হাওর, বরেন্দ্র, দ্বীপসহ কোনো ভূমি ও জলার প্রাকৃতিক রূপ ও শ্রেণি পরিবর্তন করা হবে না।
মানুষ তার খাবারের থালাকে বুঝতে শিখবে। খাদ্যব্যবস্থার দায় ও দায়িত্ব গ্রহণ করবে। খাদ্য উৎপাদন সংহারী বীজ ও প্রযুক্তি, বিষ, ভারী ধাতু, মাইক্রোপ্লাস্টিক, জীবাশ্ম জ্বালানি ও পাতালপানি মুক্ত হবে। খাদ্য উৎপাদনে কার্বন পদছাপ কমে আসবে। জলবায়ুসহিষ্ণু সার্বভৌম খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য অ্যাগ্রোইকোলজিকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করবে সব দেশ।
উষ্ণতার পারদ ১.৫ ডিগ্রি এবং জ্বালানির ন্যায্য রূপান্তর
২০৫০ সালের ভেতর লাগাতার ভোগবাদ ও পণ্য মানসিকতার অবসান ঘটবে। ইটের ভাটা, অস্ত্র উৎপাদন, ভারী কারখানাসহ অধিক কার্বন দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত খাতগুলোকে জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণে বাধ্য করা হবে। প্রকৃতি ও সংস্কৃতিবান্ধব প্রযুক্তি এবং কারিগরির বিস্তার ও বিকাশ ঘটবে বিশ্বময়। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রির ভেতরে রাখার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারগুলো সচল হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানি ঘিরে বৈশ্বিক ক্ষমতা, অন্যায় বাণিজ্য, যুদ্ধ ও সহিংসতা বন্ধ হবে। গ্যাস জরিপের নামে আর কোনো মাগুরছড়া-লাউয়াছড়ায় পরিবেশ-গণহত্যা ঘটবে না। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎসহ সব বিনাশী প্রকল্প বাতিল হবে। সব খনি ও জীবাশ্মরা স্মৃতির সংসার নিয়ে নিরাপদে পাতালেই ঘুমাবে, কোনো মুনাফা বাণিজ্য তাদের লাশ বিক্রি করবে না। পৃথিবীব্যাপী জ্বালানিব্যবস্থার ন্যায্য, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তর ঘটবে।
কার্যকর জলবায়ু চুক্তি ও জলবায়ু তহবিল
২০২৫ পর্যন্ত ৩০টি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু ২০৫০ সালেও একই রকমের অঙ্গীকারহীন, স্থবির, নির্লজ্জ সম্মেলন বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করে না। লোকাদেখানো অবহেলার সম্মেলন প্রতারণা বাতিল হয়ে এ সময়ে কার্যকর, ন্যায্য, মর্যাদার জলবায়ু সম্মেলন আয়োজিত হবে। যেখানে রাষ্ট্রপক্ষ সবাই তাদের অঙ্গীকার পূরণের সত্যিকারের গল্পগুলো বলবেন। হতাশা, আহাজারি আর প্রবল বেদনা নিয়ে কেউ সম্মেলন থেকে ফেরত যাবে না। আমাজন থেকে সুন্দরবন, হোয়াংহো থেকে হালদা, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গ্রাম ক্রোয়েশিয়ার হাম থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট গ্রাম সিলেটের শ্রীমুখ পর্যন্ত বছরব্যাপী মানুষ তার শ্রেষ্ঠ জলবায়ু সুরক্ষার কাজটি উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নেবে। বিশ্বের সব প্রান্তের সব শ্রেণি, জেন্ডার, বয়স, সংস্কৃতি ও বর্গের মানুষের প্রতিনিধিত্ব হবে নিশ্চিত।
অধিক কার্বন নিঃসরণকারী কোম্পানি ও রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব জলবায়ু তহবিল গঠন করবে। এ তহবিল বিশ্বের সব প্রান্তে ঝুঁকি ও ঝুঁকি সামালের ধরন বিবেচনায় ন্যায্যভাবে বিনাশর্তে হবে বণ্টিত। রাষ্ট্র, কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সবাই এ তহবিল ব্যবস্থাপনায় শূন্য দুর্নীতি নিশ্চিত করবে। নানামুখী ঝুঁকি, বিপদাপন্ন প্রাণবৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির বিরল সমারোহ এবং টিকে থাকার বিশেষ কৌশলগুলোকে বিবেচনায় রেখে বিশ্বের বিশেষ বাস্তুতন্ত্র ও ভূগোলের জন্য বিশেষ তহবিল কার্যকর হবে।
সব রাষ্ট্র এনডিসি জমা দেবে
প্রতি বছর জলবায়ু সম্মেলনের আগে জাতিসংঘের ইউএনএফসিসিসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি)’ প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ খাতে থেকে কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাবে এনডিসি হলো সেই পরিকল্পনা। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রতি বছর এ প্রতিবেদন জমা দিলেও দেখা গেছে অধিক কার্বন দূষণকারী দেশ যেমন, আমেরিকা, চীন এ প্রতিবেদন জমা দেয় না। ২০৫০ সালের ভেতর সব রাষ্ট্রকে এনডিসি জমা দিতে হবে।
অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু ন্যায়বিচার
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার অবসান ঘটবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার ও কর্মসূচিতে জলবায়ু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে।
শুধু অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে নয়; দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সব অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হবে এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় তৎপরতা দৃশ্যমান হবে। বন্যা, ঝড়, পাহাড়ি ঢল, খরা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, বজ্রপাত কিংবা শিলাবৃষ্টিতে একটা গান বা রন্ধনপ্রণালি কিংবা বীজদানা বা রূপকথা হারিয়ে গেলে রাষ্ট্র সতর্কবার্তা জারি করবে।
ঐতিহাসিকভাবে কার্বন দূষণকারীদের বিচার, শাস্তি ও দণ্ডের আওতায় আনতে হবে। অভিন্ন নদী ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষেত্রে অভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রিক জলবায়ু সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে। অস্ত্রবাণিজ্য, যুদ্ধ ও সামরিক খাতে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ঘটে এবং এতে পৃথিবীর সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। সামরিক কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে হবে।
জলবায়ু সংকট একটি বৈশ্বিক অনাচার। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ চাইলেও এককভাবে উষ্ণতার পারদ, ঘূর্ণিঝড়ের প্রাবল্য, খরা বা লবণাক্ততার জখম থামাতে পারবে না। ২০৫০ থেকে বাংলাদেশ বিশ্ব জলবায়ু মঞ্চের নেতৃত্ব দেবে। এর ভেতর দেশকে দক্ষ, প্রমাণমুখী ও দায়িত্বশীল জলবায়ু-কূটনীতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। রাষ্ট্র ও নাগরিক যত বেশি দেশের সর্বপ্রাণ ও সর্বজনের প্রতি দায়িত্বশীল ও দরদি হবে- এ প্রস্তুতি তত জোরালো হবে।
এক কলস পানির জন্য উপকূল থেকে পাহাড়, বরেন্দ্র থেকে নগর- বস্তিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা গরিব নারীদের কাতারে দাঁড়িয়ে তাহলে এই প্রস্তুতি শুরু হোক।
লেখক : লেখক ও গবেষক
ইমেইল : [email protected]



