তথ্যের অপরিসীম চাহিদা সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করবে

নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রযুক্তি দিয়েই লড়াই করছে। ২০৫০ সালে হয়তো বাংলাদেশেও নিমগ্ন সাংবাদিকতা বা ইমারসিভ জার্নালিজমের ব্যবহার বাড়বে। ছবি: ইন্টারনেট
প্রযুক্তির নব নব উল্লম্ফন সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবির্ভাব ঘটেছে এআই চ্যাটবটের, যারা গুছিয়ে সোর্সসহ সারাংশ করে সংবাদ পরিবেশন করতে সক্ষম। অনুবাদেও এআই দিন দিন পারদর্শী হয়ে উঠছে। সামনের দিনে হয়তো আবির্ভাব ঘটবে ইমারসিভ জার্নালিজমের। প্রযুক্তির এসব সুবিধাকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করা না হলে ক্ষেত্রটি সাংবাদিকদের জন্য সংকুচিত হয়ে আসবে
পুরনো বা ঐতিহ্যবাহী মিডিয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম বা ইন্টারনেটভিত্তিক মিডিয়ার পরিসর এরই মধ্যে বেড়ে আছে। কখনো বা টেক্সট ও স্থিরচিত্র বা শব্দ ও চলমান চিত্রের জন্য আলাদা আলাদা মাধ্যম না থেকে এক মাধ্যমেই সব ধরনের উপাদানের সম্মিলন বা কনভারজেন্স দেখা যাচ্ছে এবং এর ঠিকানা হয়েছে ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যম। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য কখনো হুমকি (মানুষ আগের মতো সংবাদের জন্য প্রিয় পত্রিকার কাছে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সংবাদ খুঁজে নিচ্ছে এবং তা পেয়েও যাচ্ছে), কখনো বা সুবিধা আকারে হাজির হচ্ছে (সংবাদপত্র বা টেলিভিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে খবর পরিবেশন করছে)। আমরা এসব পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার মধ্যেই আছি। কিন্তু এই প্রবণতা কোনদিকে যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
ক্ষতির শিকার হয়েছে সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি। বিশেষত বিজ্ঞাপনের প্রবাহ লিগ্যাসি মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যেহেতু তার ব্যবহারকারীদের মনিটর করে এবং তাদের আগ্রহ ও চাহিদার তথ্য অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সংগ্রহ করে, তাই তারা সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে বিজ্ঞাপনদাতাদের পণ্য বা সেবার তথ্য ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে সক্ষম। বিজ্ঞাপনদাতারা এই ব্যবস্থাপনায় খুশি, কারণ কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন শুধু কোকা-কোলায় আগ্রহীদের কাছেই যাচ্ছে, লেমোনেডপ্রেমীদের কাছে যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই সব বিজ্ঞাপন শুষে নিচ্ছে। এতে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমগুলো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। টিকে থাকার উপায় খুঁজতে খুঁজতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম জনসাধারণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও হিমশিম খাচ্ছে। কারণ, দর্শক-শ্রোতা এখন বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটাচ্ছে। পৃথিবীর নামি সংবাদমাধ্যমগুলোর ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশনের উদ্যোগ আছে, সেখান থেকে কিছু আয়ও হয়। অন্যদিকে, মানুষ ফ্রিতে এরই মধ্যে অনেক সংবাদ পেয়ে যাচ্ছে; ফলে সাবস্ক্রিপশনে আগ্রহ কম। আর বাংলাদেশের মানুষ টাকার বিনিময়ে সংবাদমাধ্যম সাবস্ক্রাইব করবে, সেই পরিস্থিতি থেকে অনেক দূরেই আছে। হয়তো সেরকম আস্থাবানও হয়ে ওঠেনি সংবাদমাধ্যমগুলো। বরং অনলাইনের ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তারা জনআস্থা হারিয়েছে।
সত্য-অসত্য মিশিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার, কিংবা ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল প্রতিনিধি, তার সঙ্গে তথাকথিত পেশাদার সাংবাদিকের সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণকে পার্থক্য করাই মুশকিল। অপতথ্য শুধু অনলাইনের সাধারণ ব্যবহারকারী বা তথাকথিত ইনফ্লুয়েন্সাররা ছড়ান না, বাংলাদেশের অনেক পেশাদার সংবাদমাধ্যমও প্রায়ই তা ছড়ায়।
২০৫০ সালে হয়তো বাংলাদেশেও ইমারসিভ জার্নালিজমের ব্যবহার বাড়বে। বিশেষত ভিডিও প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে, দর্শক মাথায় একটি হেডসেট লাগিয়ে নিয়ে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে ঢুকে পড়বে নিজ নিজ অবতারসহ
সংবাদ পরিবেশনার পরিবর্তনশীল ধরনকে ক্রিকেটের বিভিন্ন ফরম্যাটের সঙ্গে তুলনা করা যায়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব কমছে না, শুধু গুরুত্ব হারাচ্ছে ওয়ানডে ক্রিকেট, যেটি একসময় দর্শকের কাছে সবচেয়ে আদরণীয় ছিল। সংবাদের ক্ষেত্রেও সামনের সময়ে দেখা যাবে, ব্রেকিং বা ক্ষুদ্র আকারে সংবাদ পরিবেশন আরও বাড়বে; প্রথাগত ছোট বা মাঝারি হার্ড নিউজ কমতেই থাকবে, যা কিনা একসময় সংবাদের জনপ্রিয়তম ধরন ছিল। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারজনিত চঞ্চলতা বা ছটফটানির মধ্যেও পাঠকের কাছে বড়-ব্যাখ্যামূলক বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চাহিদা কমবে না, বরং বাড়বে। ডকুমেন্টারি ধাঁচের বড়-অনুসন্ধানী ভিডিও প্রতিবেদন মানুষ আগ্রহ সহকারে দেখবে। আলজাজিরার এক ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ কিংবা নেত্র নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো পরাক্রমশালী শেখ হাসিনার জগদ্দল সরকারকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। কিন্তু উভয় প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ছিল, বিদেশে থেকে তারা কাজ করছিল। দেশের শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, দুর্বল আর্থিক ভিত্তি নিয়ে ভবিষ্যতের এ লড়াই কত সাফল্যের সঙ্গে করা যাবে, সে একটা চ্যালেঞ্জ বটে! কিন্তু ওই প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করেছে সাংবাদিকতার শক্তি। ওইদিকে যারা নিজেদের নিয়ে যেতে পারবেন, সাংবাদিকতায় তারা প্রভাবশালী হবেন। মানুষ যখন বৃদ্ধাঙ্গুলির মাধ্যমে দ্রুত স্ক্রল করতে অভ্যস্ত, তখনো টেক্সট বা ভিডিওনির্ভর বড় প্রতিবেদন তারা পড়েন বা দেখেন, এটা একটা আশার দিক। কিন্তু সেসব প্রতিবেদনের মান ভালো হতে হবে। দ্য ডেইলি স্টার ‘স্লো রিডস’ ব্যানারে আলাদা করে কিছু মন্তব্য-কলাম ও প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। পরিবর্তিত সময়ে তাদের এই প্রয়াসকে সময়োপযোগী বা ভবিষ্যৎমুখী বলতে হবে। নেত্র নিউজে দেখা গেছে অ্যানিমেটেড প্রতিবেদন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে এইআই চ্যাটবটের। কারণ, তারাও সংবাদ পরিবেশনে মনোযোগী হয়েছে। ইয়াহু নিউজের মতো ইন্টারনেটনির্ভর ‘নিউজ অ্যাগ্রিগেটর’ একসময় জনপ্রিয় হয়েছিল। কারণ, সার্চ করলে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সংবাদকে নিমিষে হাজির করে দিত। পরে ফেসবুক-টুইটারের নিউজ ফিড পাঠকের এই চাহিদা মেটানো শুরু করে। এখন চ্যাটবটগুলো আরও গুছিয়ে সোর্সসহ সারাংশ করে সংবাদ পরিবেশন করতে সক্ষম। তাদের এই সক্ষমতা সামনে বাড়তেই থাকবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন নতুন প্রতিপক্ষ, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সামনের সময়ে তারা আরও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে হাজির হবে। এখন অনেক উপাত্তই বড় ডেটা সেট হিসেবে সাংবাদিকের টেবিলে হাজির হবে, যা দ্রুত বিশ্লেষণ ও সারাংশ করা তার জন্য কঠিনই। আর এই উপাত্ত বিশ্লেষণ ও প্রাপ্ত উপাত্তের সারসংক্ষেপ জানার ক্ষেত্রে সাংবাদিকের সহকারী হিসেবে এআই উপকারী হয়ে উঠবে। আর অনুবাদেও এআই দিন দিন পারদর্শী হয়ে উঠছে। তার সঙ্গে সাংবাদিকের মেধাবী ঘিলুটি ব্যয় করলেই দ্রুততম সময়ে সংবাদ পরিবেশনের বিষয়টিতে এআই ভালো অবদান রাখবে। তবে এআইর ওপর অত্যধিক নির্ভরতা, সাংবাদিকতা পেশাকে চৌর্যবৃত্তির অপর নাম হিসেবে মানুষ চিনবে। অতিনির্ভতার বদলে, এআইর কার্যকর ব্যবহার সাংবাদিককে সমৃদ্ধ বা ইকুইপড করে তুলবে। অন্যদিকে, সাংবাদিকতার কিছু কাজ যদি মেশিনের মাধ্যমে হয়ে যায়, তবে সাংবাদিক মানুষটি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিন্তু ডিপফেইক ভিডিও, ভুয়া ফটোকার্ডসহ বিভ্রান্তি বাড়াতে সক্ষম, যার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত হলে জনআস্থা ক্ষুণ্ণ হতেই থাকবে। এআই বিশাল উপাত্ত বিশ্লেষণ, ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ ও ট্রেন্ড শনাক্তকরণে সহায়তা করলে সাংবাদিকরা গভীর অনুসন্ধানে বেশি সময় দিতে পারেন।
২০৫০ সালে হয়তো বাংলাদেশেও নিমগ্ন সাংবাদিকতা বা ইমারসিভ জার্নালিজমের ব্যবহার বাড়বে। বিশেষত ভিডিও প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে, দর্শক মাথায় একটি হেডসেট (এইচএমডি) লাগিয়ে নিয়ে, বিম্বিত বাস্তবতায় (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি) ঢুকে পড়বে নিজ নিজ অবতারসহ এবং নিমগ্নতাসহ তাতে অংশ নেবে। কারণ, তিনি তার ডিজিটাল অবতারসহ হাজির হয়ে, সংবাদে বর্ণিত ঘটনা বা পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবেন। কম্পিউটার গেমিংয়ের নিমগ্নতায় মানুষ সংবাদ দেখবে, যেন স্ক্রিন থেকে দূরে বসে নয়, স্ক্রিনের ভেতরে, এমনকি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ঘটনার রোমাঞ্চ, সৌন্দর্য এমনকি বীভৎসতাও অবলোকন করবে।
সাংবাদিকতার এই সর্বব্যাপিতায় ক্ষমতাবান গোষ্ঠী আরও বেশি সতর্ক আরও বেশি নিয়ন্ত্রণবাদী হয়ে উঠেছে। অনেক অর্ধসত্য বা অসত্য নিজে বললেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অপছন্দের সংবাদমাধ্যমকে ফেক মিডিয়া বলে বাতিল করে দেন। সামনের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি, গ্রেপ্তার কমার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। গাজা-ওয়েস্ট ব্যাংকে যেমন ইসরায়েলের হামলায় অনেক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, সামনে তা কমবে— জোর দিয়ে বলার উপায় নেই।
শেষে বলা যায়, ব্যবসায়িক সংকট, জনআস্থার পতন, সেন্সরশিপ এবং অপতথ্যের প্রাদুর্ভাব ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি সাংবাদিকের ঘিলুর ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারে; চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে মানুষের তথ্যের অপরিসীম চাহিদা, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল সংবাদ পরিবেশনা, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধও করবে। উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল সাংবাদিকতার উদাহরণ হতে পারে— ধীর বা দীর্ঘ প্রতিবেদন, অ্যানিমেটেড স্টোরি, স্লাইডভিত্তিক পরিবেশনা, কিংবা বিম্বিত বাস্তবতায় নিমগ্ন সাংবাদিকতা।
লেখক: মিডিয়া ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজে অধ্যাপনারত





