৭ স্থপতি
ভাসানী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আসসালামু অালাইকুম

আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬)
দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবসময় শোষিতের পক্ষে ছিলেন বলেই মানুষ আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে মজলুম জননেতা হিসেবে চেনে। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এক রাজনৈতিক সফরে ময়মনসিংহ এলে তার বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত ভাসানী কংগ্রেসে যোগ দেন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে ভোগ করেন ১০ মাস কারাদণ্ড। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই দল সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন।
তখন থেকেই জমিদার ও মহাজনদের শোষণের প্রতিবাদে কৃষকদের সংগঠিত করে একের পর এক কৃষক আন্দোলন করেছেন। সরকার তার তৎপরতা বন্ধ করতে বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে বহিষ্কার করলে আসামে চলে যান। ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসানচরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করার সুবাদে সবাই তাকে ভাসানচরের মওলানা বলে আখ্যায়িত করতে থাকে। এটাই বিবর্তিত হতে হতে পরে ‘ভাসানী’ নামে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
মুসলিম লীগের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় ক্ষমতাসীন দল তার ওপর অখুশি হয়। নির্বাচনে ত্রুটি ছিল– এ অজুহাতে তাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে
১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর কংগ্রেস ত্যাগ করে যোগ দেন মুসলিম লীগে। ১৯৪০ থেকে তিনি ছিলেন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। সভাপতি নির্বাচিত হন ১৯৪৪ সালে। এ সময়ে আসামে বাঙাল খেদাও আন্দোলন তীব্র হলে এর বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগ দলের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় মুসলিম লীগের ক্ষমতাসীন সদস্যরা মওলানা ভাসানীর ওপর অখুশি হয় এবং তার নির্বাচনে ত্রুটি ছিল– এ অজুহাত দেখিয়ে আদালতে মামলা ও তাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর এক নির্বাহী আদেশবলে তার নির্বাচন বাতিল করেন।
মুসলিম লীগের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলীতে রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় ওই কর্মী সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সর্বসম্মতিক্রমে এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ে অনন্য ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ এটি ছিল স্বাধীনতার এক পরোক্ষ আগাম ঘোষণা। একই বছর মতাদর্শিক বিরোধে জেরে ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। ন্যাপের আদর্শ ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে ভাসানী বন্দি থাকেন চার বছর। তার নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পতন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ত্বরান্বিত হয়। এ সময় টাইম ম্যাগাজিন তাকে প্রফেট অব ভায়োলেন্স আখ্যা দেয়।
সত্তর সালের নির্বাচনে দলীয় মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন এবং নির্বাচনে দুটি ছাড়া সব আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দন জানান।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভাসানী প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভাসানী।
১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তার জীবনাবসান ঘটে।




