মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা ভাবলে সমাধান সহজ

ডিভাইসনির্ভরতার কারণে ব্যক্তির মধ্যে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার বোধ তীব্র হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে নানারকম সামাজিক সমস্যাও। কিন্তু সামাজিক ট্যাবুর কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় আগ্রহী হন না অনেকেই। ফলে খুব নীরবে গভীরতর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা
২০৫০ সালের ঢাকা। সকালের ব্যস্ত রাস্তায় হাজারো মানুষ ছুটছে কিন্তু কারও সঙ্গে কারও প্রকৃত সংযোগ নেই। বাসে, রিকশায়, ব্যক্তিগত গাড়িতে সব জায়গায়ই মানুষ মাথা নিচু করে ডুবে আছে মোবাইল স্ক্রিনে। পাশের মানুষের উপস্থিতি যেন অপ্রাসঙ্গিক। ***
২০৫০ সালের ঢাকা শহরের এ চিত্রটি কাল্পনিক হলেও বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অসম্ভব নয়।
এখনই এ লক্ষণগুলো আছে এবং ধীরে ধীরে হচ্ছে বিস্তৃত। মানুষ ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। মতের অমিল হলেই ব্যক্তিগত আক্রমণ যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমান, তেমনি রাস্তাঘাটে তুচ্ছ ঘটনার জের গড়াচ্ছে সহিংসতায়। কেউ ভুল কিছু বললে তাকে বোঝানোর চেষ্টা কম, অপমান করার প্রবণতা বেশি। ‘সহ্য করা’ যেন দুর্বলতার লক্ষণ। গুজব, অপপ্রচার আর কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এ অসহিষ্ণুতার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। জীবনের চাপ বেড়েছে। শহরের জীবন হয়ে উঠেছে গতিময়, ব্যয়বহুল এবং প্রতিযোগিতামূলক। চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যবসার ঝুঁকি, পরিবারের প্রত্যাশা সব মিলিয়ে মানুষ সবসময় একটা চাপের মধ্যে থাকে। সেটা জমে জমে আচরণে বের হয়— রাগ, বিরক্তি, অস্থিরতা হিসেবে।
ডিভাইস নির্ভরতা আমাদের জীবনযাত্রা দিয়েছে বদলে। স্মার্টফোন আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী এনে দিয়েছে কিন্তু আমাদের বাস্তব সম্পর্কগুলোকে করেছে দুর্বল। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মানুষের পোস্ট দেখি কিন্তু পাশের ঘরের মানুষটার সঙ্গে গভীরভাবে কথা বলি না। ‘কানেকশন’ বেড়েছে কিন্তু ‘সংযোগ’ কমেছে। একাকিত্ব বেড়েছে কিন্তু সেটা আমরা স্বীকার করতে চাই না। আমরা ভাবি, ‘আমি তো একা না, আমার তো ফেসবুকে-ইন্সটাগ্রামে হাজারো বন্ধু। কিন্তু সেই হাজার বন্ধুর মধ্যে কজনের কাছে নিজের কষ্ট খুলে বলা যায়? খুব কম। ফলে মানুষ নিজের ভেতরের যন্ত্রণাগুলো একা একাই বহন করে। এই একাকিত্ব ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নেয়।
আমরা ভাবি, আমি তো একা না, আমার তো ফেসবুকে-ইন্সটাগ্রামে হাজারো বন্ধু। কিন্তু সেই হাজার বন্ধুর মধ্যে কজনের কাছে নিজের কষ্ট খুলে বলা যায়? খুব কম।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদাসীনতা। অনেকে তাদের সমস্যাটি মানসিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলেও, সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যান না। “মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যাব? লোকে তো ‘পাগল’ ভাববে!” শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য পরিবার বা সমাজে যতটা আন্তরিকতা দেখা যায়, ‘মানসিক রোগী’দের জন্য তা মোটেও দেখা যায় না। বরং, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে করুণার চোখে, হেয় করে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। এজন্য ‘পাগল’ আখ্যায় সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত অনেক ব্যক্তিই চিকিৎসকের কাছে যান না।
এখন প্রশ্ন হলো, ২০৫০ সালের ওই কাল্পনিক বাস্তবতা এড়াতে আমরা কি বর্তমানে কিছু করতে পারি?
উত্তর— হ্যাঁ, পারি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে চেষ্টা হচ্ছেও। স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। কিছু প্রতিষ্ঠান কাউন্সেলিং সেবা চালু করেছে। কিছু মানুষ চিকিৎসা বা থেরাপি নেওয়ার কথা খোলামেলা বলতে শুরু করেছে। এটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু এ উদ্যোগগুলো সীমিত। বড় পরিসরে নীতিগত পরিবর্তন, সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন— এসব ততটা জোরালোভাবে হয়নি।
আমরা যদি এখন থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখি, তাহলে ২০৫০ সালের চিত্রটা ভিন্ন হতে পারে। এখন থেকেই যদি শিক্ষার্থীদের শুধু অ্যাকাডেমিক সাফল্য নয়, মানসিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম ভিন্নভাবে বড় হবে। যদি কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেমন— যুক্তিসংগত কাজের সময়, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, কাউন্সেলিং সাপোর্ট; তাহলে কর্মজীবী মানুষের চাপ কিছুটা হলেও কমবে। যদি পরিবারে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে সন্তান তার ভয়, ব্যর্থতা, কষ্ট নিয়ে কথা বলতে পারে দ্বিধাহীনভাবে, তাহলে অনেক সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, মানসিক সমস্যাকে ‘লজ্জার বিষয়’ না ভেবে স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করলেই সাহায্য নেওয়ার পথটা সহজ হবে।
২০৫০ সালের ঢাকার একটা বিকল্প চিত্রও কল্পনা করা যায়। মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হয়ে নয়। স্কুলে শিশুরা শুধু গণিত-ইংরেজি শিখছে না, তারা শিখছে কীভাবে নিজের অনুভূতি বুঝতে হয়, কীভাবে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়। অফিসে কাজের চাপ আছে কিন্তু তার সঙ্গে আছে মানসিক সুস্থতার জন্য সাপোর্ট সিস্টেম। মানুষ জানে, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। সোশ্যাল মিডিয়া তখনো আছে কিন্তু মানুষ সেটা ব্যবহার করছে সচেতনভাবে।
এসব কিছু বাস্তবায়নের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাজেট, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ— সব জায়গায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ— এটা স্বীকার করতে হবে। মানসিক সমস্যার ব্যাপারে সামাজিক মনোভাব বদলাতে হবে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে নিজেকেই। সঠিক সময়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের পাশাপাশি মনকেও ভালো রাখে। পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে হবে, তবে বেশি ঘুম নয়। প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নিতে হবে। করতে হবে রুটিনমাফিক শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন। বর্জন করতে হবে মাদক। ধর্মীয় ও সামাজিক সুস্থ রীতিনীতির চর্চা করতে হবে। লালন করতে হবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, ইতিবাচক সম্পর্ক। নেতিবাচকতা পরিহার করতে হবে। এড়িয়ে চলতে হবে মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে এমন কথা, কাজ বা সঙ্গ যথাসম্ভব। পারিবারিক বন্ধন করতে হবে সুদৃঢ়। এসব করলেই ২০৫০-এর সেই নীরব, বিচ্ছিন্ন শহরটা আর অনিবার্য হবে না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট






