তুমি একটু কেবল বসতে দিও

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।
মোহাম্মদপুরের বছিলায় নতুন পাসপোর্ট অফিস হয়েছে। কয়েক দিন আগে ছেলেকে নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছি।
ছবি তোলার জন্য তিনতলায় ৩০৪ নম্বর কক্ষের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ওয়েটিং রুমে একটি সোফাও আছে। দুজন বসতে পারে। লাইনে মোট তেরো-চৌদ্দ জন। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রবীণ। দুজন তরুণ সোফা দখল করে বসে আছেন। তাঁরাও সিরিয়ালে আছেন। তাঁদের মনোযোগ মোবাইলের স্ক্রলে।
সোফার পাশে দাঁড়ানো একজন প্রবীণ বললেন, “আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।”
এ কথা বলে তিনি সোফায় ঠেস দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে থাকতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও দুই তরুণের মনোযোগ মোবাইলেই। একজন বাঁ দিকে ঘুরে বৃদ্ধকে দেখলেন। প্রবীণের মুখে সাদা দাড়ি, পরনে সাদা পাঞ্জাবি। তাঁকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তরুণেরা তাঁকে বসার জায়গা দিলেন না, উঠে দাঁড়ালেনও না।
রিকশায় বাসায় ফিরতে ফিরতে ছেলেকে বললাম, “ভদ্রলোকেরই তো দোষ।”
ছেলে বলল, “তার মানে কী? উনি কী দোষ করেছেন?”
বললাম, “দোষ তো তাঁরই। তিনি তো হাত জোড় করে, অনুনয়-বিনয় করে ছেলেটিকে বলতে পারতেন, ‘বাবা, তুমি একটু কেবল বসতে দাও। একটু কেবল বসতে দিও। দু-এক মিনিট আমি একটু বসি, তারপর তুমি আবার সোফায় বসো।’”
ছেলে বলল, “তুমি কি ফান করছ? মজা করছ?”
আমি বললাম, “না, ফান করার কী আছে? মজা করারও কিছু নাই ? সময়টা এমনই! এভাবে কাকুতি-মিনতি করলে হয়তো বসার জায়গা পেতেন। লোকটা খুবই বোকা।”
বেশ কিছুদিন আগে কারওয়ান বাজার থেকে মেট্রোরেলে উঠেছি। উত্তরা যাব। উঠেই বসার জায়গা খুঁজছিলাম। ফার্মগেট পার হতেই একটা আসন পেয়ে গেলাম। আর অমনি ধপাস করে বসে পড়লাম। আহা, কী শান্তি! কী শীতলতা! কারওয়ান বাজারের গুমোট গরম থেকে মুক্তি পেলাম।
আগারগাঁও থেকে একজন বৃদ্ধা উঠলেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনি বসুন, বসুন। আমি সামনের স্টেশনেই নেমে যাব।”
তিনি কিছুতেই আমার আসনে বসলেন না। এই ফাঁকে আরেকজন এসে মাথা কাত করে আসনটা দখল করলেন।
ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনার মতো মহৎ মানুষ আজকাল খুব কম দেখা যায়।”
“দরজাটি বাম দিকে খুলবে। নেক্সট স্টেশন পল্লবী।” মেট্রোরেলের রেকর্ড করা নারী কণ্ঠের এই ঘোষণা আমি যতবারই মেট্রোতে উঠি, কান পেতে শুনি। কেন জানি, আমার খুব ভালো লাগে।
কিন্তু ওই দিন মেয়েটির কণ্ঠ আমি আর যেন শুনতে পাচ্ছিলাম না। কেবলই ‘মহৎ’ শব্দটি আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
ভদ্রমহিলার কথাটি শুনে আমি কেমন অসুস্থ বোধ করছিলাম। আমার কানে বাজতে লাগল, “আপনার মতো মহৎ মানুষ আজকাল খুব কমই দেখা যায়।”
যা খুব স্বাভাবিক, আমি তো শুধু তা-ই করেছি। তারপরও তিনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে, কোন ক্ষোভ থেকে আমাকে মহৎ বললেন? বেশ কয়েক দিন আমাকে এই ‘মহৎ’ শব্দটা খুব ভুগিয়েছে।
গত পরশু ফেসবুকে আমার চোখ আটকে গেল। আমি ছেলেকে ডাকলাম, “এই দেখ, কী হয়েছে! সেদিন তোকে পাসপোর্ট অফিসের লোকটার কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, লোকটারই তো দোষ। আমি ঠিকই বলেছিলাম। তুই তো আমার কথা মানলি না।”
ও বলল, “কেন, কী হয়েছে?”
বললাম, “একজন লোক মেট্রোরেলে উঠেছিলেন। মেট্রোতে ভিড়, বসার জায়গা নেই। তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন। বসার জায়গা চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে কেউ বসতে দেয়নি।”
“তারপর কী হলো?”
“তিনি আরও অসুস্থ বোধ করলেন। একপর্যায়ে তাঁর স্ট্রোক হলো। তিনি মারা গেলেন।”
ছেলেকে বললাম, “আমার কথাই সত্যি হলো। অসুস্থ লোকটা যদি হাত জোড় করতেন, কাকুতি-মিনতি করতেন, ‘একটু কেবল বসতে দিও’ বলতেন, তাহলে তো আর তাঁকে মরতে হতো না!”
পুনশ্চ
হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বন্ধু মাসুদ দেওয়ানের সঙ্গে দেখা। দেখেই বলল, “মেট্রোরেলের ঘটনাটা জানিস তো? আমাদের কিছু একটা করা দরকার।”
বললাম, “অবশ্যই। মুরুব্বিদের কীভাবে সম্মান করতে হয়, সেটা আসলে শেখানো দরকার। আদবকায়দা শেখানোর জন্য দেশে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তার আগে মিটিং-মিছিল, আন্দোলন করতে হবে। জনগণের সম্পৃক্ততা চাই। এই যে আমরা প্রবীণদের বসতে দিচ্ছি না, এটা তো জাতীয় সমস্যা!”



