গণমাধ্যমকে বাঁচানোর পথ কী

গত দুই দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচলিত গণমাধ্যমের ব্যবসায়িক কাঠামোকে প্রায় ভেঙে দিয়েছে। সংবাদপত্র আর টেলিভিশনের জায়গা দখল করে নিয়েছে অ্যালগরিদমনির্ভর নিউজফিড।
একসময় সংবাদমাধ্যমের আয়ের বড় উৎস ছিল বিজ্ঞাপন। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপনের বড় অংশ এখন চলে গেছে গুগল আর মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ফলে দুনিয়া জুড়ে সংবাদপত্রগুলো কর্মী ছাঁটাই করছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি অনেক সংবাদমাধ্যম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে মনোযোগের জন্য। যে খবর বেশি উত্তেজনা তৈরি করে, যে শিরোনাম বেশি মানুষকে ক্লিক করায়, সেটিই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এখানে ভালো সাংবাদিকতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল। ফলে তথ্যের প্রাচুর্য তৈরি হলেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের সংকট বাড়ছে। মানুষ খবর পড়ছে, কিন্তু সেই খবরের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে বাঁচানোর উপায় নিয়ে যারা ভাবনাচিন্তা করছেন, তাদের একজন হামিশ ম্যাকেঞ্জি। তিনি নিজে একজন সাংবাদিক, লেখক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এ সাংবাদিক একসময় প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলায় প্রধান লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টেসলা নিয়ে তার লেখা বই ‘ইনসেন মোড’ বেশ পরিচিত।
ম্যাকেঞ্জি বলছেন, একটা সময় সংবাদপত্রের সঙ্গে তার পাঠকের একটি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হতো। পাঠক জানতেন, সকালে যে পত্রিকা তার দরজায় পৌঁছায়, সেটা শুধু খবর সরবরাহ করে না, পৃথিবীকে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে দেয়। পত্রিকার সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে পাঠক আর কোনো নির্দিষ্ট সংবাদপত্রের পাঠক নন, তিনি ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা গুগলের ব্যবহারকারী। কোন খবরটি তিনি পড়বেন, কোন লেখকের লেখা তার চোখে পড়বে, এমনকি কতক্ষণ তিনি একটি খবরের দিকে তাকিয়ে থাকবেন, তার অনেক কিছুই ঠিক করে দেয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।
ম্যাকেঞ্জি মনে করেন, এ সংকট থেকে বের হওয়ার পথ হতে পারে পাঠকনির্ভর গণমাধ্যম। আর সেটা কেমন? ম্যাকেঞ্জি নিজে সেটার একটা মডেল তৈরি করেছেন। আর সেটার নাম সাবস্ট্যাক। ২০১৭ সালে ক্রিস বেস্ট ও জাইরাজ শেঠির সঙ্গে মিলে তিনি সাবস্ট্যাক নামে একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। এর লক্ষ্য সাংবাদিক, লেখক আর পাঠকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা। এখানে লেখককে বিজ্ঞাপনদাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করতে হবে না। পাঠক সরাসরি লেখকের লেখা পড়বেন এবং পছন্দ হলে সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে তাকে অর্থ দেবেন। অর্থাৎ লেখকের আয়ের উৎস হবে তার পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা নয়।
সাবস্ট্যাকে একজন লেখক নিজের নামে একটি প্রকাশনা শুরু করতে পারেন। সেখানে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করেন তিনি। পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারেন এবং অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন চালু করতে পারেন। এর জন্য তার কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক কিংবা প্রকাশকের অনুমতির প্রয়োজন নেই। একজন স্বাধীন সাংবাদিকও নিজের পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
সাবস্ট্যাক বিপুলভাবে সফল হয়ে উঠেছে। ফলে ম্যাকেঞ্জির স্বপ্ন আর তেমন কল্পনাবিলাস নয়। এ প্ল্যাটফর্মে এরই মধ্যে ৫০ লাখের বেশি সাবস্ক্রিপশন তৈরি হয়েছে। মানে ৫০ লাখ পাঠক কোনো না কোনো লেখকের লেখা টাকা দিয়ে পড়ছেন। ইতিহাসবিদ হিদার কক্স রিচার্ডসন থেকে শুরু করে বহু সাংবাদিক, লেখক ও বিশ্লেষক এ প্ল্যাটফর্মে নিজেদের পাঠক তৈরি করেছেন। তাদের কেউ কেউ সাবস্ক্রিপশন থেকে ভালো আয় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা অনেক সাংবাদিকের জন্য সাবস্ট্যাক হয়ে উঠেছে নতুন আশ্রয়। শুধু সাংবাদিক নয়, সব ধরনের লেখকের জন্যই সাবস্ট্যাক একটা নতুন আশ্রয়। সেটা ভ্রমণ লেখক হোক, আর হোক ফিকশন লেখক।
গণমাধ্যমকে বাঁচানোর নতুন প্রস্তাব নিয়ে ম্যাকেঞ্জি একটি বইও লিখেছেন। নাম ‘হাউ টু সেইভ দ্য মিডিয়া’। সেটা প্রকাশ হবে এ নভেম্বরেই, আরও পরে।
তবে এখানে কিছু প্রশ্ন আছে। সাবস্ট্যাক কি সত্যিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে? নাকি এটা আরেকটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম? এখানে লেখকদের নিজের পরিচিতি তৈরি করতে হয়, পাঠক বাড়ানোর জন্য নিয়মিত প্রচার চালাতে হয়। অ্যালগরিদমের প্রভাবও একেবারে অনুপস্থিত নয়। ফলে যে মনোযোগের অর্থনীতি থেকে মুক্তির বাণী ম্যাকেঞ্জির মূল মন্ত্র, সেটার কিছু বৈশিষ্ট্য সাবস্ট্যাকেও থেকে গেছে। আবার পাঠককে অর্থ দিয়ে লেখা পড়তে হলে তার ক্রয়ক্ষমতা থাকতে হয়। সুতরাং সাবস্ক্রিপশননির্ভর সাংবাদিকতা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ম্যাকেঞ্জির মূল কথাটা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলছেন, প্রযুক্তি নয়, গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ পাঠকের আস্থা। একটি সংবাদমাধ্যম যত বড়ই হোক, পাঠক যদি তার ওপর বিশ্বাস হারান, তাহলে তার ভবিষ্যৎ নেই। একইভাবে একজন লেখক যদি নিজের পাঠকের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন, তাহলে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের আশ্রয় ছাড়াও তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্যও এ ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখানে সংবাদপত্র শিল্পের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ায় এখন কারও হাতে কোনো বিকল্প মডেল নেই। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মানসম্পন্ন লেখালেখি টিকিয়ে রাখতে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন। সাবস্ক্রিপশন সেই বিকল্পের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাবস্ক্রিপশন নয়। ব্যক্তি পর্যায়ের সাবস্ক্রিপশন। প্রযুক্তি আমাদের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কী ধরনের সাংবাদিকতা প্রবেশ করবে, তা নির্ভর করবে লেখক ও পাঠকের ওপর।
বাংলাদেশের কিছু লেখক সাবস্ট্যাকে লেখা আপলোড করছেন, দেখছি। এখনো কোনো সাবস্ক্রিপশন বা পে-ওয়াল চোখে পড়েনি কারও।
গণমাধ্যমকে বাঁচানোর প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত পাঠককে ফিরে পাওয়ার প্রশ্ন। পাঠক যখন আবার সাংবাদিক বা লেখককে চিনবেন, লেখকের ওপর আস্থা রাখবেন এবং তার কাজের জন্য অর্থ দিতে আগ্রহী হবেন, তখনই হয়তো সাংবাদিকতার নতুন ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।



