জলের উজ্জ্বল শস্য

ইলিশ বাঙালির কাছে চিরকালীন এক দুর্বলতার নাম
বাঙালি যে ইলিশকে ‘মাছের রাজা’ উপাধিটা চিরকালের জন্য দিয়ে রেখেছে তা ইলিশ মাছ জানে না; জানার কথাও না। তাকে রাজা উপাধি দেয়ায় বাকি প্রজা মাছেদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ আছে কি না সে খবরও তাদের অতল রাজ্য থেকে এই স্থলভাগে এসে পৌঁছায় না। কিন্তু মাছের বাজারে ঢুকলে ইলিশের দাম শুনে বুকের ভিতরে ছাঁৎ করে ওঠে। মনে হয়-হ্যাঁ, রাজাই বটে। স্বাদে যেমন অনন্য তেমনি দামেও।
আষাঢ় মাস ফুরিয়ে ভাদ্র শুরু হয়েছে। বাজারে ইলিশেরও কোনো কমতি নেই। কিন্তু দামের ব্যারোমিটারে পারদ একেবারে স্থির; নিচে নামছেই না। দোকানের ঝুড়িতে স্তুপ করে রাখা ঝকঝকে ইলিশ দেখতে দেখতে কিনতে ব্যর্থ কোনো ক্রেতার রসিক মন্তব্য শোনা যায়-মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অস্থিরতায় কি ইলিশের দামও মিসাইলের মতো আকাশে উড়াল দিয়েছে, আর মাটিতে নামবে না?
তবুও বৃষ্টি নামলে প্রথমেই মনে পড়ে ইলিশ মাছের কথা। ভাজা ইলিশ মাছ, সঙ্গে খিচুড়ি, সর্ষের তেল আর পোড়া মরিচ-বাঙালির চিরকালীন এক দুর্বলতার নাম। সে দূর্বলতা কখনো পতনও ঘটায় দামের দূর্গের। অসীম সাহসে ভর করে কোনো কোনো ক্রেতা কিনে ফেলেন একটি ঝকঝকে ইলিশ। বুদ্ধদেব বসু কবিতায় ইলিশকে ডেকেছেন ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’ বলে। এক কেজি ওজনের ইলিশে প্রায় নয়শ’ কাঁটা থাকায় ভয় পেয়েছিল বাংলা জয় করা ইংরেজরাও। অপঘাতে মৃত্যু এড়াতে তারা প্রথমে এই মাছের দিকে হাত বাড়াতে সাহস করেনি। ষড়যন্ত্র করে পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়া আর কাঁটা-চামচ দিয়ে ইলিশের রসাস্বাদন করা যে এক কথা নয় তা সাহেবরা ভালোই উপলব্ধি করেছিল। তাই কাঁটা ছাড়া ভাঁপা ইলিশ রান্নার রেসিপি আবিষ্কৃত হওয়ার আগে তাদের মন ইলিশে দূর্বল হয়নি।
বর্ষায় অতুলনীয় ইলিশ পাতে না উঠলে বাঙালির অক্ষেপ যায় না। নোনা পানির গভীর থেকে বহু যোজন পথ পাড়ি দিয়ে এসে বঙ্গদেশের মিষ্টি পানিতে যেন তৃপ্তি খুঁজে পায় মাছের রাজা। আর বাঙালি সম্ভবত একমাত্র জাতি যারা এই মাছ রান্নায় বিচিত্র রন্ধনপ্রণালী অনুসরণ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে। ইলিশের ঝোল, শর্সে ইলিশ, ইলিশের মাথা দিয়ে মাষকালাইয়েরর ডাল অথবা কাঁটা দিয়ে সবজি-কোন রেসিপি নেই বাঙালির রন্ধনশালায়! বিচিত্র রন্ধনপ্রণালীতে ইলিশের স্বাদকে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে বাঙালির রান্নায় শৈল্পিক দক্ষতার পরিচয় মেলে।
কথাশিল্পী
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে ইলিশ মাছ ধরার বিশদ বিবরণ আছে।
তিনি লিখেছেন, ‘‘জাল যখন টানা হয়,
রাতের অন্ধকার কাটিয়া পানির তলা হইতে রূপালী আলো ঠিকরিয়া
ওঠে। একের পর এক ইলিশ মাছ জালে ছটঁফট করিয়া উঠিয়া আসে। যেন আলোর চাবুক খাইয়া
পদ্মার বুক হইতে রূপালী পরীগুলি জালের ফাঁদে আসিয়া ধরা দিতেছে’’।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পে ইলিশ মাছের উপস্থিতি জীবনের ভিন্ন বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হেদায়েত উল্লাহর চাল-ডাল কেনার সামর্থ না থাকলেও ইলিশের মরশুমে বাজারে পদ্মার তাজা ইলিশের ঘ্রাণ তার চৈতন্যকে অস্থির করে তোলে। গল্পে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন, ‘‘মাছের আঁশ ছড়িয়ে থাকে বটির চারপাশে, কিন্তু ঘরের হাঁড়িতে চাল নেই। ইলিশের গন্ধ শুধু ক্ষুধা বাড়ায়, আর সেই ক্ষুধা রূপ নেয় এক ধরণের উন্মাদনা আর যন্ত্রণায়’’।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বছরে গড়ে ৫.৫ থেকে ৫.৭১ লক্ষ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়ে আমাদের দেশে। গোটা পৃথিবীতে আহরিত ইলিশের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ একক ভাবে ধরা পড়ে বাংলাদেশের জলসীমায়।
বুদ্ধদেব বসুর ‘ইলিশ’ কবিতায় এই মাছ অন্য এক দ্যোতনায় ধরা দিয়েছে।
‘‘রাতের আঁধারে নদী ধরে রূপালী শিখা,
জেলের জালে এসে বন্দী হয় প্রাণ,
সে যেন কেবলই এক মাছ নয় আর
পদ্মার বুঁকে আঁকা রূপালী গান।’’
ইলিশ নিয়ে বাঙালির ভালোবাসার স্রোত কখনো ফুরিয়ে যায় না, যাবেও না। এই মাছকে মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনের এক বিরহ-মধুর প্রেম, যা পকেট শূন্য করে, তার কাঁটা খলনায়কের মতো ভূমিকায় অভিনয় করে, কিন্তু রান্না ইলিশের ঘ্রাণ যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন বাঙালির চাইতে আর কে সুখী?







