আমার হৃদয়ে বাঁচো
শুধু কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি

ইরাজ আহমেদ। স্কেচ: আগামীর সময়
আড্ডায় এক কবি বন্ধু প্রায়ই রগড় করে বলত, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট একদিন চুকে যাবে কিন্তু কবিতায় আর এম.এ পাস করা হবে না।’
‘কবিতায় এম.এ পাস করা কি এক ধরণের অমরত্ব পেয়ে যাওয়া?’
আরেক কবি বন্ধু পাশ থেকে কথাটা ছুঁড়ে দেয়।
অমরত্ব শব্দটা মনের মধ্যে অদ্ভুত ধরণের তরঙ্গ তোলে! আড্ডা ভেঙে গেলে হাঁটতে হাঁটতে অনেক বছর আগের আমি আবার হাঁটতে থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস পেছনে রেখে পুরনো শহরের দিকে। কাপ্তান বাজারে সেই সময়ে প্রখ্যাত হয়ে ওঠা এক ছাপড়া রেস্তোরাঁয় ভাত খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু মাথার ওপর দুপুরের রোদের মতো ‘অমরত্ব’ শব্দটাও ছায়া দেয় না; পুড়িয়ে মারে। তখন শক্তি আর সুনীল প্রিয় কবি। বিনয় বা উৎপল মনের ঘেরাও ভেঙে ঢুকে পড়েনি। আচমকা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন মনে পড়ে, ‘‘শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি’’।
অনেক বছর পর হয়ত তেমনই সমান্তরাল এক দুপুরে পথ হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল ভীষণ অন্যরকম দিনগুলোর কথা। মনে পড়ল সেই কবি বন্ধুদের কথা যারা শুধু কবিতার জন্য অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করতে চেয়েছিল একদিন। স্পষ্ট দেখতে পাই তাদের। বিকেলে টিএসসির দেয়ালে আজও যেন একা পড়ে থাকে ইস্তেকবাল হোসেনের ছায়া। হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকানে থেকে রোকেয়া হলের দিকে যায় দীর্ঘদেহী ছায়াপ্রায় কবি শিমুল মোহাম্মদ। রিকশা চড়ে কোথায় যেন ঘুরতে চলে যায় কবি শ্যামল জাকারিয়া আর তারিক সুজাত। অমরত্বের পেয়ালা ঠেলে সরিয়ে এক ঝাঁক কবি তখন আঁকড়ে ধরেছিল কবিতাকে। চার্লস বোদল্যের, আবুল হাসান, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, নবারুণ ভট্টাচার্যে তাদের আত্মহননের পেয়ালা বরে উঠেছিল।
১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলার সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ কবির একটি সম্মিলিত কাব্যগ্রন্থ ‘ভেঙে যাও প্রতিবিম্ব’ প্রকাশিত হয়েছিল। দুই মলাটে বন্দী পাঁচ জন কবির একগুচ্ছ করে কবিতা। সেই বই নিয়ে আমাদের সে কী তুমুল হল্লা। যত দূর মনে পড়ে, জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রথম দিকের কবিতা উৎসব ছিল তখন। বইটি বিক্রি হয়েছিল হাতে হাতে। ইস্তেকবাল হোসেনের ‘এক শীত শবনম’, শ্যামল জাকারিয়ার ‘জলরঙ’ অথবা শিমুল মোহাম্মদের ‘স্বপ্নবিদ্ধ বিনতার চোখ’ অংশের কবিতাগুলোর অনেক পংক্তি তখন দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আশির দশকের মাঝামাঝি আচমকাই কবিদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো কবি আবুল হাসানের জন্মদিন পালন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন বন্ধ। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন তখন আগুনের তাপ হারিয়ে খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। কবি তারিক সুজাতের উদ্যোগে হাসানের একটি পোস্টার তৈরি করে দিলেন শিল্পী ইফসুফ হাসান। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোটা এলাকায় সেই পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হলো। পোস্টারের শিরোনাম হয়েছিল আবুল হাসানের কবিতার লাইন— সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে।
বিকেলে টিএসসিতে অনুষ্ঠান। অল্প কিছু শ্রোতা দর্শক উপস্থিত। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কবি নির্মলেন্দু গুণ আর প্রয়াত অধ্যাপক, কবি হুমায়ূন আজাদকে। ঘড়ির কাটা পাঁচটা পার হয়ে গেলেও গুণ এলেন না। হুমায়ূন আজাদ এসেছিলেন। স্মৃতির কাছে নতজানু হতেই মনে পড়ে, আমরা সেদিন আবুল হাসানের কবিতা থেকে আবৃত্তি শুনেছিলাম ইস্তেকবাল আর তারিক সুজাতের কন্ঠে। হুমায়ূন আজাদ স্যার আবুল হাসানের স্মৃতিচারণ করেছিলেন অনেকটা সময় নিয়ে। অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে সেদিন টের পেয়েছিলাম শীতের সংক্ষিপ্ত সন্ধ্যা নেমে আসছে। সবাই কেমন বিচ্ছিন্ন আর এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম সেই সন্ধ্যায় হয়ত আবুল হাসানের কবিতা নিয়ে ভাবতে ভাবতে।
তখন কবিতার খসড়া কবিরা লিখে রাখত স্টার সিগারেটের প্যাকেটের ভিতরে এক চিলতে সাদা কাগজে। পাছে হারিয়ে যায় এই ভয়ে অসমাপ্ত কবিতার কয়েক লাইন লেখা ছেঁড়া কাগজ জমা থাকত হাকিম ভাইয়ের কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর মাঠের এক পাশে ছিল হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকান। দুটো কেৎলি, কয়েকটা চায়ের কাপ আর দুপুরে বিবর্ণ বনরুটি-বিস্কুটের সম্পত্তি নিয়ে হাকিম ভাই হয়ে উঠেছিলেন লাইব্রেরী সংলগ্ন মাঠের সম্রাট। আশির দশকে মাঠটার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘হাকিম চত্বর’। কী জমা থাকত না হাকিম ভাইয়ের কাছে তখন! অবৈধ অস্ত্র থেকে শুরু করে কবিতার খসড়া।
কবিদের জীবন সম্ভবত আমরা তখন যাপন করেছিলাম। বিস্বাদ হয়ে ওঠা শহর, ভালোবাসাহীন জীবন আর নেশার গভীর আচ্ছন্নতা সেই সময়ে কবিদের আকন্ঠ দখল করে রেখেছিল। রাতের অন্ধকারে গেরিলা পদ্ধতিতে আচমকা কবিতা আবৃত্তি করে উঠত ইস্তেকবাল হোসেন। কবি শ্যামল জাকারিয়ার দেখা মিলত ভাষা ইন্সটিটিউটের ভাঙা দেয়ালেও ওপর। প্রয়াত শিমুল মোহাম্মদ অস্থির এক কবি। কখনো মিছিল, সংঘর্ষ আবার কখনো মধুর ক্যান্টিনে বসে বিনতার জন্য অপেক্ষায় অস্থির হয়ে লিখে ফেলা কবিতা, ‘‘অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টের’’।
তারা কবিতার জন্য তাচ্ছিল্য করেছিল অমরত্বকে। তাই হয়ত শিমুল প্রয়াত। ইস্তেকবাল আর তারিক সুজাত অসুস্থ। শ্যামল জাকারিয়া নিঃশ্বাস ফেলবার জায়গা খোঁজে এই শহরে। দিন যায় আমাদের। সময় ফুরিয়ে আসে ধূসর শহরে।





