আজও বৃষ্টি ঝরছে সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের শরীরে

সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পার হয়ে যশোর রোড ধরে মানুষের দীর্ঘ সারি এগিয়ে চলেছে
পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধের আগুন কি নেভাতে পেরেছে কবিতা? আগ্রাসন আর যুদ্ধবাজীর নিদারুণ বাণিজ্যের মাঠে কবিতায় সংগঠিত কয়েকটি লাইন কি পরাক্রমশালী অন্যায়ের বিরুদ্ধে শীতের বাতাসে ঝরে পড়া পাতার মতো উড়ে যায় কোনো প্রান্তরে? না, কবিতা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় রক্তপাতের বিরুদ্ধে, যুদ্ধের মাঠে বোমায় তছনছ হয়ে যাওয়া মাটিতে নিজের পা গেঁথে নিয়ে কবিতা কথা বলে অনেক বছর পরেও; এক নিমেষে দেখিয়ে দেয় তার অর্থছবিকে।
বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পৃথিবীর ইতিহাসে এক উত্তাল সময়। পরিবর্তনকামী এক সময়। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হওয়া জনমত সংগঠিত হওয়ার সেই সময়ে প্রতিবাদের প্রথম সারিতে অবস্থান নিয়েছিল কবিতা। আমেরিকার বিট জেনারেশনের প্রধানতম কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ৫৫ বছর আগে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘুরে এসে লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামে ১৫২ লাইনের দীর্ঘ এক কবিতা। আমেরিকার প্রখ্যাত দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসে ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকাশের পরেই কবিতাটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল এবং একটি যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যকর্ম।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে বৃষ্টি নেমেছে আবার। কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে অর্ধ দশকের বেশি সময় পরেও বৃষ্টির পর্দায় ফুটে ওঠা অসহায় শরনার্থীদের অন্তহীন মিছিলের ছবি, দুঃখ যন্ত্রণার ছবি ফিরিয়ে দিল।
‘জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শিশুদের শরীর
লক্ষ শিশু আকাশে তাকিয়ে আছে অসহায়
তারা অপেক্ষা করছে মৃত্যুর জন্য।’
সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ। তখনও বৃষ্টি ঝরছে যুদ্ধের আগুনে পোড়া বাংলাদেশে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। সীমান্ত পার হয়ে মানুষের দীর্ঘ সারি এগিয়ে চলেছে। তাদের গন্তব্য অনিশ্চিত ঠিকানা শরনার্থী শিবির। শিশুরা ধুঁকছে ক্ষুধায়, মৃত্যু এসে ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ, অসহায় মানুষগুলোর পায়ের তলায় দাঁড়াবার জায়গা বলতে গভীর কাদামাটি। তাদের খাবার নেই, ওষুধ নেই, পেছনের পথে পোড়া ভিটেমাটির স্মৃতি। তাদের কান্না মিশে যাচ্ছে সেপ্টেম্বরে ঝরে পড়া বৃষ্টির সাথে। অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় এসেছিলেন তখন। শরনার্থী শিবির দেখতে গিয়ে নৌকায় চড়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্তের যশোর রোডে। তখন তার সঙ্গী কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই কাদা ভেঙে, বৃষ্টি ভেঙে শরনার্থী শিবিরগুলোতে মানবতার পতন দেখতে দেখতে, মৃত্যু আর যন্ত্রণার তাড়া খাওয়া মানুষের জীবনের শেষদৃশ্যগুলো কবির আত্মাকে গভীর আঁধারে আচ্ছাদিত করেছিল। তিনি সঙ্গে থাকা রেকর্ডারে সেখানে বসেই ধারণ করেছিলেন নিজস্ব তীব্র মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিবেদন। ধারণ করেছিলেন সেই ভয়ংকর, অমানবিক প্রেক্ষাপটের নানা শব্দ।
শব্দ আর দৃশ্যের আঘাতে খান খান হয়ে ভেঙে গিয়েছিল গিন্সবার্গের চেতনা। চোখে দেখা দৃশ্যের সঙ্গে কবির চেতনাপ্রবাহ মিশে গিয়ে জন্ম দিয়েছিল ভীষণ সংবেদী এক কবিতা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ জানায়, যশোর রোড ভ্রমণ শেষে ফিরে সে রাতে কলকাতায় তারই বাড়িতে ছিলেন গিন্সবার্গ। সেখানে বসেই কবি রেকর্ডারে ধারণ করা প্রতিক্রিয়া লিখে ফেলেছিলেন নোটবইতে। তৈরি হয়ে গিয়েছিল ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার খসড়া। হারমোনিয়াম বাজিয়ে তিনি এক ধরনের সুরারোপও করেছিলেন লাইনগুলোতে। পরবর্তী সময়ে আরেক প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলান কবিতাটিকে গানে রূপান্তর ঘটান। তখনকার রেকর্ড কোম্পানি অ্যপেল রেকর্ড অ্যালবামটি প্রকাশ করে।
সেই প্রতিক্রিয়াময় রাতের অল্প কিছুদিন পর অ্যালেন গিন্সবার্গ ফিরে গিয়েছিলেন নিউইয়র্কে। তখন বঙ্গদেশে শরৎকাল ফুরিয়ে যায়নি। কবি নিউইয়র্কে বসেই কবিতার ১৫২টি লাইন চূড়ন্ত করেছিলেন। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ছাপা হয় নভেম্বরে। তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই শীত নেমেছিল পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তখন বিজয় অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। গিন্সবার্গ বন্ধু সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলান এবং অন্য যন্ত্রীদের নিয়ে কবিতাটিতে সুরারোপ করে নিজে গাইতে শুরু করলেন আমেরিকার নানা জায়গায়। তার উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্য ত্রাণ তহবিল গঠন করা। তাদের সেই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন আরেক প্রখ্যাত পশ্চিমা সঙ্গীতশিল্পী জোয়ান বায়েজ।
তখন মার্কিন সরকার তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বন্দুকে গুলির ভরার জন্য সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছিল। সেই একই চিত্র চোখে পড়ে সত্তরের দশকে আরেক ঝড়ের কেন্দ্র ভিয়েতনামে। সেখানকার গভীর জঙ্গলের কাদামাটির সঙ্গে যশোর রোডের কাদামাখা পথ—সবখানেই কবিদের কবিতা হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র। কবিতা এখনো যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, রক্তপাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ৫৫ বছর অতিক্রম করে এসেও তা আন্দোলিত করে অন্য এক সময়কে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটকে। একে কবিতার রাজনীতি অথবা রাজনৈতিক কবিতার পরিচয়ে বেঁধে ফেলা যায় না। কবিতা এভাবেই সত্যকে প্রকাশ করে ইতিহাসের ভিতর থেকে। সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কবি লিখে চলেন তার অসামান্য বেঁচে থাকার গল্প, প্রতিবাদের শব্দকে।





