শতবর্ষের ঐতিহ্যে গড়পাড়া ইমামবাড়ির আশুরা আয়োজন

মানিকগঞ্জের গড়পাড়া ইমামবাড়ি দরবার থেকে আশুরার শোক মিছিল
মহররমের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানিকগঞ্জের গড়পাড়া এলাকায় বদলে যায় পরিবেশ। সাধারণ দিনের নীরবতা ছাপিয়ে সেখানে শুরু হয় এক দীর্ঘ প্রস্তুতি। শোক, স্মরণ, ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগের মিশেলে গড়ে ওঠে এমন এক আয়োজন, যা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শতাধিক বছরের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে গড়পাড়া ইমামবাড়ির আশুরা কর্মসূচি দেশের অন্যতম আলোচিত মহররম আয়োজন হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ৬১ হিজরিতে সংঘটিত সেই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তার আত্মত্যাগ মুসলিম বিশ্বের আবেগ, শ্রদ্ধা ও স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। এই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর মহররম মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো মানিকগঞ্জেও এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন হয়ে থাকে।
গড়পাড়া ইমামবাড়ির আশুরা আয়োজনের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর। ১৯২১ সালে আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ খলিলুর রহমান এর সূচনা করেন। তবে এর পেছনের ইতিহাস আরও পুরনো। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার মা মোসাম্মাৎ বিবি মরিয়ম ভারতের বিহার অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এবং মহররম স্মরণানুষ্ঠানের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ছিল। সেই পারিবারিক ঐতিহ্যই পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় গড়পাড়া ইমামবাড়ি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
মহররম মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমামবাড়িতে শুরু হয় ১০ দিনের কর্মসূচি। চাঁদরাতেই ঐতিহ্যবাহী ডংকার শব্দে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় আয়োজনের। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত এই বাদ্যযন্ত্র স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এরপর প্রতিদিন মিলাদ, ফাতেহা, নফল ইবাদত, আলোচনা এবং কারবালার ঘটনাবলি স্মরণে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজনের একটি বিশেষ দিক হলো কাসেদের দল। মহররমের শুরু থেকেই প্রায় ৩০টি দল বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। জারী ও মার্সিয়ার মাধ্যমে তারা কারবালার ঘটনা তুলে ধরেন। মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নাটোরের লালপুর এবং আশপাশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে তারা সফর করে। আশুরার দিন দুপুরের মধ্যে এসব দল আবার ইমামবাড়িতে ফিরে আসে।
১০ মহররমের মূল আকর্ষণ বিশাল শোক মিছিল। জোহরের নামাজ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকালে মিছিল শুরু হয়। তাজিয়া, তাবুত, দুলদুলের প্রতীকী উপস্থাপনাসহ হাজারো নিশান নিয়ে মিছিলটি গড়পাড়া থেকে মানিকগঞ্জ শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোক ও শ্রদ্ধার আবহে অংশগ্রহণকারীরা কারবালার শহীদদের স্মরণ করেন। সন্ধ্যার দিকে মিছিল সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে পৌঁছায়।
সেখানে ইফতার ও মাগরিবের নামাজের পর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি অতিথি, কূটনীতিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা এতে অংশ নিয়েছেন। সভার শেষে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়।
গড়পাড়া ইমামবাড়ির শোক মিছিল প্রথমদিকে স্থানীয় হাটখোলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ১৯২৪ সালে মানিকগঞ্জের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি শহরে মিছিল নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তখন ইমামবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা হজরত শাহ খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু কারবালার শহীদদের স্মরণ এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যুক্ত করা যাবে না। সেই শর্ত মেনেই প্রথমবারের মতো মিছিলটি মানিকগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। এর পর থেকেই প্রতিবছর ঐতিহ্যটি অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয়োজনের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিরা ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে শাহ আরিফুর রহমান বাবু ও শাহ শাহজাদা রহমান বাঁধনের তত্ত্বাবধানে ইমামবাড়ির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আশুরার দিনে গড়পাড়া ইমামবাড়িতে সমবেত হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই আয়োজন শুধু একটি শোকানুষ্ঠান নয়; বরং মানিকগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষ পেরিয়েও কারবালার স্মৃতি ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে গড়পাড়া ইমামবাড়ি।




