হারুত-মারুত আসলে কারা, তাদের কাজ কী ছিল?

প্রতীকী ছবি
বাবেল বা ব্যাবিলন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক ঐতিহাসিক নগরী। ইতিহাসের পাতায় নানা কারণে এ শহরের পরিচিতি থাকলেও ইসলামী আলোচনায় ‘ব্যাবিলন’ নামটি উচ্চারিত হলে বিশেষভাবে মনে পড়ে হারুত ও মারুতের কথা। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাদুবিদ্যার প্রসঙ্গ, আর সেই সূত্রে তৈরি হয়েছে নানা কাহিনি ও জনশ্রুতি। কিন্তু হারুত ও মারুত আসলে কারা? তারা কি সত্যিই দুই ফেরেশতা? নাকি অন্য কোনো পরিচয় রয়েছে তাদের?
এর উত্তর খুঁজতে হলে লোককথার দিকে নয়, ফিরে যেতে হবে পবিত্র কোরআনের কাছে।
হারুত ও মারুতের নাম এসেছে সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَ اتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡكِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَ مَا كَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَ لٰكِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ كَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَكَیۡنِ بِبَابِلَ هَارُوۡتَ وَ مَارُوۡتَ ؕ وَ مَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَكۡفُرۡ ؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡهُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِهٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَ زَوۡجِهٖ ؕ
আর সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানরা যা আবৃত্তি করত তারা তা অনুসরণ করেছে। আর সুলাইমান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত জাদু ও (সে বিষয় শিক্ষা দিত) যা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপর নাযিল হয়েছিল। তারা উভয়েই এই কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা; কাজেই তুমি কুফরী করো না’। তা সত্বেও তারা ফিরিশতাদ্বয়ের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতো। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১০২)
আয়াতে ব্যবহৃত الْمَلَكَيْنِ (আল-মালাকাইনি) শব্দের অর্থ ‘দুই ফেরেশতা’। এর ভিত্তিতেই অধিকাংশ মুফাসসির হারুত ও মারুতকে দুই ফেরেশতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তাবারি ও ইমাম ইবন কাসির (রহ.) তাদের তাফসিরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কেন আল্লাহ তাদের বাবেল শহরে পাঠিয়েছিলেন?
নবী সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকালে ইরাকের বাবেল (ব্যাবিলন) শহর ছিল শয়তানদের কুফরি ও জাদুবিদ্যার প্রধান কেন্দ্র। সে সময় শয়তান ও দুষ্ট জাদুকররা মানুষের মাঝে দুটি চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল:
(এক) তারা দাবি করত, সুলাইমান (আ.) কোনো নবী নন, বরং তিনি একজন মস্ত বড় জাদুকর এবং জাদুর জোরেই তিনি পুরো পৃথিবী ও জিন-পরীদের শাসন করছেন।
(দুই) তারা জাদুর ভেল্কিবাজিকে আল্লাহর পাঠানো নবীদের ‘মুজিজা’ (অলৌকিক ক্ষমতা)-এর সমতুল্য বলে প্রচার করত, ফলে সাধারণ মানুষ সত্য নবী ও জাদুকরের পার্থক্য বুঝতে পারছিল না।
এই বিভ্রান্তি দূর করতে আল্লাহ তাআলা মানুষের বেশে দুজন ফেরেশতা (হারুত ও মারুত)-কে বাবেল শহরে পাঠান। তাদের পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল-
(১) পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া: মানুষকে তাত্ত্বিকভাবে এটা শেখানো যে, "মুজিজা" হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পবিত্র অলৌকিকত্ব, আর "জাদু" হলো কিছু গোপন সূত্র ও শয়তানি বিদ্যা খাটিয়ে করা চোখের পলক বা ভেল্কিবাজি।
(২) সুলাইমান (আ.)-এর পবিত্রতা প্রমাণ: তারা মানুষকে স্পষ্ট করে দেন যে, সুলাইমান (আ.) জাদুকর ছিলেন না, তিনি আল্লাহর সত্য নবী ছিলেন।
হারুত ও মারুত কাউকে জাদু শেখানোর আগে সতর্ক করে দিতেন, ‘আমরা তো পরীক্ষা মাত্র। অতএব তুমি কুফরি করো না।’ অর্থাৎ জাদু শেখানোকে তারা ভালো বা বৈধ কাজ হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং মানুষকে পরীক্ষার বিষয়টি জানিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
এরপর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ এমন জ্ঞান শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব হতো। তবে সঙ্গে সঙ্গেই আয়াতের পরের অংশেই মহান আল্লাহ তাআলঅ একটি মৌলিক সত্য জানিয়ে দিয়েছেন—
وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১০২)
অর্থাৎ জাদুর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই। সবকিছুর ওপর আল্লাহর কর্তৃত্বই চূড়ান্ত।
সুলাইমান (আ.) কি জাদু করতেন?
হারুত-মারুতের আলোচনার সঙ্গে নবী সুলাইমান (আ.)-এর নামও এসেছে। তৎকালীন কিছু লোক সুলাইমান (আ.)-এর অসাধারণ ক্ষমতা ও রাজত্বকে জাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত করত।পবিত্র কোরআন সেই অপবাদ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে—
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا
‘সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১০২)
অর্থাৎ সুলাইমান (আ.) জাদুকর ছিলেন না। তাঁর বিশেষ ক্ষমতাগুলো ছিল আল্লাহপ্রদত্ত। পবিত্র কোরআনে তার জন্য বাতাস ও জিনদের অনুগত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত :৮১-৮২; সূরা সাবা, আয়াত : ১২-১৪)
‘জোহরা’ কাহিনি কতটা সত্য?
হারুত-মারুতকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত গল্পগুলোর একটি হলো ‘জোহরা’ নামের এক নারীর কাহিনি। এতে তাদের পৃথিবীতে আগমন, কোনো নারীর প্রতি আকর্ষণ, মদপান, হত্যা এবং নানা পাপের ঘটনা বর্ণিত হয়।
কিন্তু এসব বর্ণনাকে সহিহ হাদিস হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ ধরনের কাহিনির বড় অংশ দুর্বল সূত্র ও ইসরাইলি বর্ণনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এগুলোকে হারুত-মারুতের নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। ইবন কাসিরও তার তাফসিরে এ ধরনের বর্ণনার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
কারণ ফেরেশতাদের সম্পর্কে কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে—
لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
‘তারা আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তাদের যা আদেশ করা হয়, তারা তা-ই করে।’ (সূরা আত-তাহরিম, আয়াত : ৬)
তাই হারুত-মারুতের নামে প্রচলিত গল্পের চেয়ে কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্যকেই প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
আমাদের জন্য শিক্ষা
হারুত-মারুতের ঘটনা শুধূ রহস্য বা কৌতূহলের বিষয় নয়। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য গভীর সতর্কবার্তা। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেছেন, মানুষ এমন কিছু শিখত, যা তাদের ক্ষতি করে, উপকার করে না।
আজও নানা তাবিজ-কবচ, জাদু, গণক, জ্যোতিষ ও অলৌকিকতার নামে মানুষের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে নানা প্রতারণা চলছে। হারুত-মারুতের ঘটনা আমাদের শেখায়, অদৃশ্য জগতের প্রতি কৌতূহলের চেয়ে ঈমান ও সত্যের প্রতি আনুগত্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
হারুত ও মারুতকে ঘিরে যত গল্পই প্রচলিত থাকুক, কোরআনের শিক্ষা একেবারে পরিষ্কার: জ্ঞান যদি মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ক্ষতির পথে নিয়ে যায়, তবে সেই জ্ঞান তার জন্য কল্যাণ নয়।
তাই লোককথার চমক নয়, কোরআনের সত্যই হোক আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



