যেসব ভুলের কারণে দোয়া কবুল হয় না

প্রতীকী ছবি
দোয়া একজন মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ইবাদত। দোয়া হচ্ছে বান্দার অসহায়ত্বের স্বীকৃতি এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার প্রকাশ। মহান আল্লাহ তার বান্দাদের দোয়া করতে উৎসাহিত করেছেন এবং কবুলের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য যেমন কিছু শর্ত রয়েছে, তেমনি এমন কিছু ভুলও আছে, যা দোয়ার গ্রহণযোগ্যতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই দোয়া করার আদব জানা যেমন জরুরি, তেমনি যেসব আচরণ ও পদ্ধতি পরিহার করা উচিত, সেগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। নিম্নে তেমনি কিছু বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে-
১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে দোয়া করা
দোয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। তাই এটি শুধু আল্লাহর কাছেই করা যাবে। কোনো পীর, অলী, কবর, গাছ বা অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে সাহায্য চাওয়া কিংবা তাদের নামে প্রার্থনা করা শিরক, যা সবচেয়ে বড় গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৪৭৭)
এ জন্যই গাইরুল্লাহর কাছে চাওয়ার অভ্যাস থেকে বের হতে না পারলে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হতে থাকে।।
২. শরিয়তসম্মত নয় এমন উপায়ে উসিলা বা মাধ্যম গ্রহণ করা
আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় কোরআন ও সুন্নাহসম্মত পন্থা অনুসরণ করা উচিত। যেমন আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে দোয়া করা, নিজের নেক আমলকে অসিলা বানানো বা জীবিত কোনো নেককার ব্যক্তির কাছে দোয়ার অনুরোধ করা শরিয়তসম্মত।
কিন্তু শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন উপায়ে তাওয়াসসুল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে, ‘হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তির মর্যাদার উসিলায় আমাকে সন্তান দান করুন’ বা ‘অমুক পীরের হক বা মর্যাদার উসিলায় আমার দোয়া কবুল করুন’। এ ধরনের তাওয়াসসুল শরিয়তসম্মত নয়।
তবে এভাবে বলা যাবে যে, ‘হে আল্লাহ! আমি যদি কোনো নেক আমল করে থাকি, তার বরকতে আমার এ দোয়া কবুল করুন।’ (যেমন গুহাবন্দী তিন ব্যক্তির হাদিস, সহিহ বুখারি)
৩. বিপদে পড়ে মৃত্যুকামনা করা
রোগ, দারিদ্র্য বা কোনো বিপদে পড়ে মৃত্যুর জন্য দোয়া করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বিপদের কারণে মৃত্যুকামনা না করে। যদি একান্তই বলতে হয়, তবে বলবে: ‘হে আল্লাহ! যতদিন আমার জন্য জীবন কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন। আর যখন মৃত্যু আমার জন্য উত্তম, তখন আমাকে মৃত্যু দান করুন।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৬৭১)
৪. আখিরাতের শাস্তি দুনিয়ায় চেয়ে নেওয়া
কখনো কখনো কেউ নিজের গুনাহের জন্য
অনুতপ্ত হয়ে বলে বসেন,
‘হে আল্লাহ!
আখিরাতে যে শাস্তি দেবেন, তা দুনিয়াতেই দিয়ে দিন।’ এটি ইসলামের শিক্ষা নয়। কারণ মানুষ
আল্লাহর শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। একজন সাহাবি অসুস্থ হয়ে এমন দোয়া
করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি তো তা সহ্য করতে পারবে না।’ এরপর তিনি
শিক্ষা দিলেন যে, তুমি
এভাবে দোয়া কর: ‘রব্বানা
আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আযাবান্নার।’
‘হে আমাদের রব!
আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’
(সহিহ
মুসলিম, হাদিস:
২৬৮৮)
অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে কষ্ট বা শাস্তি নয়, বরং ক্ষমা, সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ কামনা করাই একজন মুমিনের আদব।
৫. নিজের, সন্তান
বা সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা
রাগের মাথায় নিজের, সন্তান বা সম্পদের অকল্যাণ কামনা করা উচিত নয়। কারণ এমন সময় দোয়া কবুলের মুহূর্ত এসে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের, সন্তানদের বা সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না।’ (মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯)
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জন্য দোয়া করা
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ইসলামে বড় গুনাহ। তাই এমন দোয়া করা, যাতে পরিবারের মধ্যে বিচ্ছেদ বা সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তা কখনোই বৈধ নয়।
৭. আল্লাহর রহমতকে সংকীর্ণ করে ফেলা
দোয়ার মধ্যে আল্লাহর রহমতকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা উচিত নয়। যেমন, ‘শুধু আমাদেরই রহমত দিন’ বা ‘শুধু আমাদের এলাকাতেই বৃষ্টি দিন’ এ ধরনের দোয়া ইসলামের উদার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৮. দোয়ার আদব ও শালীনতা উপেক্ষা করা
দোয়ার সময় আল্লাহর প্রশংসা, বিনয়, ভক্তি ও সম্মান বজায় রাখা জরুরি। এমন শব্দ বা সম্বোধন ব্যবহার করা উচিত নয়, যা শোভন নয় বা আল্লাহর মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণবর্ণনা করতেন এবং নিজের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করতেন।
৯. নিজে দোয়া না করে শুধু অন্যের দোয়ার ওপর নির্ভর করা
অনেকে মনে করেন, তিনি গুনাহগার বলে তার দোয়া কবুল হবে না। তাই নিজে দোয়া না করে শুধু অন্যদের কাছে দোয়ার অনুরোধ করেন। এটি সঠিক মানসিকতা নয়। প্রত্যেক বান্দার উচিত নিজেই আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে হাত তুলে দোয়া করা। অন্যের কাছে দোয়ার অনুরোধ করা বৈধ হলেও নিজের দোয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
দোয়া কবুল হওয়া শুধু মুখের ভাষার ওপর নির্ভর করে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশুদ্ধ আকিদা, সঠিক নিয়ত, শরিয়তসম্মত পদ্ধতি এবং বিনয়পূর্ণ মনোভাব। তাই একজন মুসলিমের উচিত দোয়ার আদব মেনে চলা এবং এমন সব ভুল থেকে বেঁচে থাকা, যা দোয়ার গ্রহণযোগ্যতায় বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শুদ্ধভাবে তাঁর কাছে দোয়া করার এবং কবুল হওয়া দোয়ার সৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




