কন্যাসন্তানের প্রতি উত্তম আচরণ, কী বলে ইসলাম

প্রতীকী ছবি
একসময় আরব সমাজে কন্যাসন্তানকে অপমান, লাঞ্ছনা এমনকি জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথাও প্রচলিত ছিল। সেই সমাজেই ইসলাম কন্যাসন্তানকে আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের এই বিপ্লব ছিল অনন্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন,
يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ
‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা শূরা, আয়াত : ৪৯)
এ আয়াতে কন্যাসন্তানের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মধ্য দিয়ে আল্লাহ কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। কারণ জাহেলি সমাজ কন্যাসন্তানকে লজ্জা মনে করত, অথচ ইসলাম তাকে সম্মানিত করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তানদের প্রতি সদাচরণকে জান্নাত লাভের অন্যতম আমল হিসেবে ঘোষণা করে হাদিসে বলেছেন,
مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ
‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এ কথা বলে তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৩১)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ ابْتُلِيَ مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ بِشَيْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ
‘যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪১৮; মুসলিম, হাদিস : ২৬২৯)
এখানে ‘ابتلي’ শব্দটি এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ পরীক্ষা নেওয়া। অর্থাৎ কন্যাসন্তান আল্লাহর এক বিশেষ পরীক্ষা। কেউ যদি ধৈর্য, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করে, তবে তা তার মুক্তি ও জান্নাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম শুধু জন্মের পর কন্যার প্রতি সদাচরণের কথা বলেনি; বরং জন্মের সংবাদ শুনেও বিরক্ত না হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে জাহেলি যুগের মানুষের মানসিকতার সমালোচনা করে বলা হয়েছে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ
‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে কাতর থাকত।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৫৮)
আজও সমাজের অনেক স্থানে পুত্রসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ এবং কন্যাসন্তানকে অবহেলার প্রবণতা দেখা যায়। কোথাও কন্যাকে বোঝা মনে করা হয়, কোথাও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, আবার কোথাও উত্তরাধিকার ও সম্পদের অধিকার থেকেও দূরে রাখা হয়। এসব প্রবণতা ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ রেখে গিয়েছেন। তিনি ফাতিমা (রা.)-কে অত্যন্ত সম্মান করতেন। ফাতিমা (রা.) তার কাছে এলে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে নিজের জায়গায় বসাতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২১৭)
এ আচরণ শুধু পিতৃস্নেহ ছিল না; বরং পুরো উম্মতের জন্য একটি শিক্ষা ছিল যে, কন্যাসন্তান সম্মান, স্নেহ ও মর্যাদার দাবিদার।
কন্যাসন্তানের প্রকৃত হক আদায় শুধু খাদ্য ও পোশাক দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলা এবং যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার দায়িত্ব।
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তার হৃদয় নিষ্পাপ মাটির মতো। যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই গড়ে উঠবে। (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন)
একটি কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আজ যখন বিশ্ব জুড়ে নারী নির্যাতন, বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের ঘটনা বাড়ছে, তখন ইসলামের এ শিক্ষাগুলো সবার সামনে তুলে ধরা খুবই প্রয়োজন। ইসলাম কন্যাসন্তানকে করুণা করেনি, প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে না করে জান্নাত লাভের মাধ্যম মনে করে।
তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ না হয়ে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাদের প্রতি সদাচরণ করা উচিত। কারণ যে ঘরে কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা ও মর্যাদা দেওয়া হয়, সে ঘরেই নেমে আসে রহমত ও বরকত।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




