প্রতিপক্ষের মধ্যেও যিনি মানুষকে দেখতেন

প্রতীকী ছবি
মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় বিরোধী পক্ষের সঙ্গে তার আচরণে। আপনজনের প্রতি কোমল হওয়া সহজ; কিন্তু যে মানুষ আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, অপমান করেছে কিংবা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তার প্রতিও ন্যায়, সংযম ও মানবিকতা ধরে রাখা কঠিন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এই কঠিন মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা কখনেই ভুলে যাননি।
পবিত্র কোরআনেও তাঁর এই চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮)। অর্থাৎ বিরোধিতা ন্যায়বোধকে বাতিল করে দেয় না। শত্রুতাও মানুষের প্রতি দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় না।
মহানবী (সা.)-এর জীবনে তায়েফের ঘটনা মানবিকতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী উদাহরণগুলোর একটি। তিনি যখন তায়েফবাসীকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে গিয়েছিলেন, তারা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। বরং তাঁকে এমনভাবে নির্যাতন ও পাথর নিক্ষেপ করা হয় যে শরীরে রক্ত ক্রমে নিচে নামতে নামতে তাঁর জুতাগুলো রক্তে ভিজে যায়।
সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে মহানবী (সা.)-কে জানালেন, তিনি চাইলে দুই পাহাড়ের মাঝখানে তাদের পিষে দিতে পারেন। কিন্তু নবী (সা.) প্রতিশোধের অনুমতি দিলেন না। তিনি বললেন,
بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ
‘বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।’ ঘটনাটি সহিহ বুখারিতে আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে। (বুখারি, হাদিস : ৩২৩১)
এখানে মহানবী (সা.) শুধু অত্যাচারীদের বর্তমান আচরণ দেখেননি; তিনি তাদের ভবিষ্যৎও দেখেছিলেন। যারা তাঁকে পাথর মেরেছিল, তাদের সন্তানদের মধ্যেও তিনি হেদায়াতের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। প্রতিপক্ষের শরীরে নয়, তার অন্তরের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় তাঁর দৃষ্টি ছিল।
উহুদের যুদ্ধেও মহানবী (সা.) গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়, দাঁত মোবারক শহীদ হয় এবং সাহাবিরা তাঁর চারপাশে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতেও তাঁর প্রতিক্রিয়াতে প্রতিশোধের আগুণ ছিলনা।
পবিত্র কোরআন তাঁর চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে বলেছে:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ
‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
এই আয়াত শুধু সাহাবিদের সঙ্গে তাঁর কোমলতার বর্ণনা নয়; বরং তাঁর নেতৃত্বের দর্শনও প্রকাশ করে। তিনি কঠোরতার মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাননি, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষকে পরিবর্তন করতে চেয়েছেন।
আমরা যদি মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষিতের দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাই যে, মক্কার যে মানুষগুলো তাঁকে এবং তাঁর সাহাবিদের দীর্ঘদিন নির্যাতন করেছিল। তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল। সাহাবিদের ওপর নির্মম অত্যাচার করেছিল। বহু বছর পর সেই মক্কাই যখন তাঁর সামনে বিজিত হয়ে গেল, প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা তাঁর হাতে। সাধারণত মানব সভ্যতায় দেখা যায়; বিজয়ীরা প্রায়ই পরাজিতদের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু মহানবী (সা.) বিজয়ের মুহূর্তকে প্রতিহিংসার উৎসবে পরিণত করেননি। বরং-
* ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা।
* নিরাপত্তা দেন পুরোনো শত্রুদের।
* পরিবারের সদ্যদের নির্মমভাবে হত্যাকারিকেও ক্ষমা করে নিরাপত্তা দেন।
* শত্রু নেতাদের সম্মান অটুট রেখ মানবতার নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেন।
মক্কা বিজয়ের এই সাধারণ ক্ষমার বিস্তারিত বিবরণ ইবন ইসহাকের সিরাত, ইবন হিশামের আস-সিরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ এবং ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তে বর্ণিত হয়েছে।
নবীজি (সা.) এর এই আচরণের মূলনীতি কোরআনের ভাষায়:
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
‘মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম পন্থায়।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪)
এর পরেই আল্লাহ বলেন, এমন আচরণের ফলে যে ব্যক্তি ও তোমার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ইসলামের লক্ষ্য কেবল প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; সম্ভব হলে শত্রুতার দেয়াল ভেঙে মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে ফিরিয়ে আনা।
একবার একটি ইহুদি ব্যক্তির জানাজা পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবিরা বললেন, ‘এ তো একজন ইহুদির জানাজা।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
أَلَيْسَتْ نَفْسًا
‘সে কি একজন মানুষ নয়?’ (বুখারি, হাদিস : ১৩১১; মুসলিম, হাদিস : ৯৬১)
এই ছোট্ট ঘটনাটি তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা প্রকাশ করে। ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি মুসলিম ও অমুসলিমের পার্থক্য জানতেন, কিন্তু মানবিক মর্যাদার জায়গায় তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতেন।
মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষকে তার অতীতের ভুল দিয়ে চূড়ান্তভাবে বিচার করতেন না। কারণ তিনি জানতেন, মানুষ পরিবর্তিত হতে পারে। গতকালের বিরোধী মানুষটি আগামী দিনের সহযাত্রী হতে পারে।
আজ মতের অমিল খুব দ্রুত ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক মতভেদ, ধর্মীয় বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্ক কিংবা পারিবারিক বিরোধে আমরা প্রায়ই মানুষটির বক্তব্যের সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বকেও আক্রমণ করি। ভিন্নমতকে শত্রুতা মনে করি। ফলে যুক্তির জায়গা নেয় বিদ্বেষ, সংশোধনের জায়গা নেয় অপমান এবং সংলাপের জায়গা নেয় প্রতিশোধ।
এই জায়গাতেই মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় ছিলেন, কিন্তু অন্যায়কারীর মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তিনি মতের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু মানুষকে ঘৃণার বস্তুতে পরিণত করেননি। তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে ক্ষমাকে বেছে নিয়েছেন। কারণ তাঁর হৃদয়ে মানুষকে ধ্বংস করার চেয়ে মানুষকে পরিবর্তন করার আকাঙ্ক্ষাই ছিল প্রবল।
তাঁর চরিত্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
এই রহমত কেবল তাঁর অনুসারীদের জন্য ছিল না। তাঁর জীবন দেখিয়ে দেয়, সত্যের প্রতি অবিচল থেকেও মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া যায়; অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা যায়; আর প্রতিপক্ষের মধ্যেও এমন একজন মানুষকে দেখা যায়, যার হৃদয় একদিন সত্য ও কল্যাণের দিকে ফিরে আসতে পারে।
তাই মহানবী (সা.)-এর এই শিক্ষা আজ শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়, অনুশীলনের বিষয়। মিলাদুন্নবীর প্রকৃত তাৎপর্য হয়তো এখানেই যে আমরা তাঁর জন্ম ও জীবনের কথা বলার পাশাপাশি তাঁর সেই মানবিক দৃষ্টিকে নিজেদের জীবনে ফিরিয়ে আনি, যে দৃষ্টি প্রতিপক্ষের মধ্যেও মানুষকে দেখতে শেখায়।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






