মহানবী (সা.)-এর অনন্য কূটনৈতিক প্রটোকল

প্রতীকী ছবি
কূটনীতি সাধারণত রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং পারস্পরিক সম্পর্কের হিসাব-নিকাশের সঙ্গে যুক্ত। বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধির প্রতি সৌজন্য দেখানো সহজ; কিন্তু যে রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ, তার দূতও যখন হুমকি ও ঔদ্ধত্যের বার্তা নিয়ে আসে, তখনও তার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা বড় কঠিন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এই কঠিন পরীক্ষায়ও এক অনন্য নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছে। তাঁর কূটনৈতিক আচরণে প্রতিপক্ষের প্রতি দুর্বলতা ছিল না, আবার শত্রুতার কারণে সৌজন্য ও মানবিকতাও বিসর্জিত হয়নি। মতাদর্শিক বিরোধের মধ্যেও তিনি প্রতিনিধির মর্যাদা রক্ষার এক অসাধারণ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এর সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ পারস্য সম্রাট কিসরার পাঠানো দুই দূতের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন তৎকালীন বিশ্বের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠাচ্ছিলেন, তখন পারস্য সম্রাট কিসরার কাছেও একটি পত্র পাঠান। পত্রে ভাষা ছিল,
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللهِ إِلَى كِسْرَى عَظِيمِ فَارِسٍ، سَلامُ اللهِ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، وَآمَنَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ، وَشَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، وَأَدْعُوكَ بِدَاعِيَةِ اللهِ -عَزَّ وَجَلَّ- فَإِنِّي أنا رَسُولُ اللهِ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً، لأُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا، وَيِحِقُّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ، فَأَسْلِم تَسْلَمْ فَإِنْ أَبَيْتَ، فَإِنَّ إِثْمَ الْمَجُوسِ عَلَيْكَ
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, এ পত্র মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’র পক্ষ থেকে পারস্যের মহান সম্রাট কিসরার প্রতি। যে সত্য পথের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্য ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল— তাদের প্রতি সালাম। আমি আপনাকে সুমহান আল্লাহর আহ্বানের দ্বারাই আহ্বান জানাচ্ছি। নিশ্চয় আমি গোটা মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসুল হিসেবে এসেছি। যেন যারা জীবিত আছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহর বাণী সত্যে পরিণত হবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপদে থাকুন। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তাহলে এ মাজুসীদের (অগ্নি উপাসক) সকল পাপ আপনার ওপর বর্তাবে।’
কিন্তু কিসরা এই পত্রকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ তো করেইনি, বরং ক্রোধে সেটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। এরপর ইয়ামানের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দেয়, যেন সে এমন দুজন সাহসী লোক মদিনায় পাঠায়, যারা মুহাম্মদকে (সা.) গ্রেফতার করে কিসরার সামনে হাজির করতে পারে। বাযান সেই নির্দেশ অনুযায়ী বাবওয়াইহ ও খারাখসারাহ নামে দুজন দূতকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পাঠায়। তারা মদিনায় এসে তাঁকে জানায়, কিসরার নির্দেশে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তাদের পাঠানো হয়েছে। এমনকি তারা সতর্ক করে দেয় যে, তিনি তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলে কিসরা তাঁর দেশ ও সম্প্রদায় ধ্বংস করে দিতে পারে।
একবার ভাবা যাক পরিস্থিতিটিকে। একজন বিদেশি সম্রাট তাঁর কাছে একটি পত্র পাঠিয়েছে, পত্রের জবাবে পত্র নয়, বরং তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য লোক পাঠিয়ে দিল। সেই লোকেরা তাঁর নিজের শহরে এসে তাঁকে সম্রাটের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তেজিত হয়ে তাঁদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নিলেন না। তাঁদের হত্যা করলেন না, অপমান করলেন না কিংবা ভয় দেখিয়ে বিদায়ও করলেন না। বরং তাঁদের পরদিন আবার আসতে বললেন।
এই ঘটনাতেই প্রকাশ পায় তাঁর কূটনৈতিক চরিত্রের অনন্যতা। দূতরা যে বার্তা বহন করছে, তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দূতদের অপরাধ এক করে দেখেননি। বার্তার রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাব তিনি দিয়েছেন, কিন্তু বার্তাবাহকের মানবিক মর্যাদা নষ্ট করেননি। এ এক গভীর কূটনৈতিক শিক্ষা: বিরোধী রাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু তার প্রতিনিধির প্রতি অমানবিক হওয়া যায় না।
পরদিন তিনি সেই দূতদের ডেকে জানালেন, আল্লাহ কিসরার বিরুদ্ধে তার পুত্র শিরোইয়াহকে ক্ষমতাবান করেছেন এবং সে তার পিতাকে হত্যা করেছে। দূতরা বিস্মিত হয়। তারা জানতে চায়, তিনি কি সত্যিই নিশ্চিত হয়ে এ কথা বলছেন? রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের বললেন, তারা যেন বাযানকে এ সংবাদ জানিয়ে দেন। একই সঙ্গে তাকে এটাও জানাতে বললেন যে, ইসলাম গ্রহণ করলে তার অধীনস্থ অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর শাসন তার হাতেই থাকবে এবং তার সম্প্রদায়ের সন্তানদের ওপর তাকে বাদশাহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বিদায়ের সময় তিনি তাদের একজন খারাখসারাহকে স্বর্ণ-রৌপ্যখচিত একটি কমরবন্দও উপহার দেন।
মূলত রাসুল (সা.) দূতদের পরদিন আসতে বলার রাতেই মহান আল্লাহর পক্ষা থেকে এসব সংবাদ পেয়েছিছেন।
ঘটনার পরবর্তী পরিণতিও বিস্ময়কর। বাযান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই কিসরার পুত্র শিরোইয়াহর পত্র এসে পৌঁছাল, যাতে কিসরাকে হত্যার সংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাঁকে কোনো রকম বিরক্ত না করতে বলা হয়েছিল। তখন বাযান ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয় এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল।’ এরপর তিনি এবং ইয়ামানে পারস্যের অধীনস্থ বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। দূতদের একজনও স্বীকার করেছিলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো প্রভাবশালী কোনো মানুষের সঙ্গে কখনো কথা বলেননি, অথচ তাঁর সঙ্গে কোনো পুলিশ বা বাহিনী ছিল না। (ত্বাবারী, তারীখুল উমামি ওয়াল মুলূক, ৩/৯০; ইবন কাসীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ, ২/১৫৮-১৬১)।
কিসরার দূতদের সঙ্গে এই আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বরং অমুসলিমদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কূটনৈতিক আচরণে এটি ছিল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি। বিশ্বের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর কাছে পাঠানো তাঁর চিঠিগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তাঁদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে অস্বীকার করেননি। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশে লেখা পত্রের শুরুতে ছিল,
«مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ»
‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের মহান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি।’ (বুখারি, হাদিস ৫৪৫৩; মুসলিম, হাদিস ১৭৭৩)।
পারস্য সম্রাট কিসরাকে লিখেছেন,
مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللهِ إِلَى كِسْرَى عَظِيمِ فَارِسٍ
‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের মহান সম্রাট কিসরার প্রতি।’ (ত্বাবারী, তারীখুল উমামি ওয়াল মুলূক, ৩/৯০-৯১; ইবন কাসীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ, ৩/৫০৮-৫১০)।
মিসরের শাসক মুকাওকিসকে লিখেছেন,
إِلَى الْمُقَوْقِسِ عَظِيمِ الْقِبْطِ ,
অর্থাৎ ‘কিবতদের মহান অধিপতির প্রতি।’ (ত্বাহাবী, মুশকিলুল আছার, ১১/১৩৬)।
আর হাবশার নাজ্জাশিকে লিখেছেন,
إِلَى النَّجَاشِيِّ الْأَصْحَمِ عَظِيمِ الْحَبشَةِ ,
অর্থাৎ ‘হাবশার মহান অধিপতি আসহাম নাজ্জাশীর প্রতি।’ (হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ২/৬৩৩; বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়্যাহ, ৩/৩০৮)।
এখানে কূটনীতির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা রয়েছে। ইসলাম নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকতে শেখায়, কিন্তু সেই দৃঢ়তা অন্যের সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে অস্বীকার করার শিক্ষা দেয় না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকট।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৮)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দূতদের সঙ্গে আচরণে এই কোরআনিক নীতির বাস্তব রূপ দেখা যায়। দূতদের ধর্ম, জাতি কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, তিনি তাঁদের সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানাতেন। তাঁদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল, খাবারের ব্যবস্থা করা হতো, তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হতো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপঢৌকনও দেওয়া হতো। ফারুক হাম্মাদাহ তাঁর আল-আলাকাতুল ইসলামিয়্যাহ আন-নাসরানিয়্যাহ ফিল আহদিন্নাবাবিয়্যি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) দূতদের অভ্যর্থনা, থাকা-খাওয়া, উপঢৌকন প্রদান এবং তাঁদের আরাম-আয়েশের বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিতেন।
সালামান গোত্রের প্রতিনিধিরা এলে তিনি তাঁর খাদেম সাওবানকে নির্দেশ দেন,
أَنْزِلْ هَؤُلَاءِ الْوَفْدَ حَيْثُ يَنْزِلُ الْوَفْدُ
‘এই প্রতিনিধিদের সেখানে রাখো, যেখানে প্রতিনিধিরা অবস্থান করেন।’ (ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/৩৩২)। বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মদিনায় দূত ও প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ আবাসনের ব্যবস্থাও ছিল। কোনো কোনো বর্ণনায় রমলাহ বিনতে হারেস নাজ্জারিয়্যার বাড়িতে দূতদের থাকার কথা পাওয়া যায়। কিলাব, মাহারেব, আযরাহ, আবদে কায়েস, তাগলিব ও গাসসানসহ বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরাও বিশেষ ব্যবস্থায় অবস্থান করতেন। (ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/৩০০-৩৪৮; ইবনুল আছীর, উসদুল গাবাহ, ৬/১১৯)।
দূতদের উপঢৌকন দেওয়াও ছিল তাঁর নিয়মিত রীতি। বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সাহাবিদের তিনি অসিয়ত করে বলেন,
«أَجِيزُوا الْوَفْدَ بِنَحْوِ مَا كُنْتُ أُجِيزُهُمْ»
‘তোমরা দূত ও প্রতিনিধিদের সেভাবে উপঢৌকন দেবে, যেভাবে আমি তাদের উপঢৌকন দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩০৫৩)।
এই নির্দেশের তাৎপর্য গভীর। কারণ এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আচরণের একটি নৈতিক বিধান হিসেবে তিনি তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন।
অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিও তাঁর এই সম্মানবোধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত খায়বারের ঘটনা। খায়বার বিজয়ের পর সেখানে কিছু ধর্মগ্রন্থ পাওয়া যায়, যার মধ্যে তাওরাতও ছিল। ইহুদিরা তাদের ধর্মগ্রন্থ ফেরত চাইলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে তা তাদের ফিরিয়ে দেন। (আল-ওয়াকেদী, আল-মাগাযী, ১/৬৮১)।
অবশ্যই ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বিশ্বাসের পার্থক্য অন্যের ধর্মীয় সম্পদ, ব্যক্তি-মর্যাদা কিংবা দূতীয় দায়িত্বের প্রতি অবমাননার অনুমতি দেয় না। মহানবী (সা.) এই পার্থক্যটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আজকের পৃথিবীতে কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিধিবদ্ধ। রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তা, দূতাবাসের মর্যাদা, কূটনৈতিক দায়মুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আচরণবিধি এখন আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর মদিনার রাষ্ট্রে বহু শতাব্দী আগে দূত ও প্রতিনিধিদের প্রতি যে সম্মানজনক আচরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল আইনগত বাধ্যবাধকতার চেয়েও গভীর একটি বিষয়: মানুষের মর্যাদাবোধ।
তাই কিসরার দূতদের ঘটনা শুধু একটি ঐতিহাসিক কাহিনি নয়; এটি নেতৃত্বেরও পরীক্ষা। ক্ষমতাবান ব্যক্তি তার অনুগতদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, তা দিয়ে তাঁর চরিত্রের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তখন, যখন সামনে থাকে বিরোধী, সমালোচক কিংবা শত্রুর প্রতিনিধি। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই পরীক্ষায় এমন এক মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, যেখানে বিরোধিতা তাঁর সৌজন্যকে পরাজিত করতে পারেনি।
মহানবী (সা.)-এর কূটনৈতিক প্রটোকলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই হলো: মতাদর্শের দৃঢ়তা এবং মানবিক সৌজন্য পরস্পরের বিরোধী নয়। নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেও অন্যের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও দূতের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা যায়। প্রতিপক্ষের নীতির বিরোধিতা করেও তার ব্যক্তিগত মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা যায়।
এই কারণেই মহানবী (সা.)-এর কূটনীতি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে নয়, মানবিক সভ্যতার ইতিহাসেও একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে অপমান করার মধ্যে নয়; বরং প্রতিপক্ষের সামনেও নিজের নৈতিক উচ্চতা অক্ষুণ্ন রাখার মধ্যে। তাঁর জীবনে কূটনীতি ছিল ক্ষমতার ভাষা নয়, চরিত্রের ভাষা। আর সেই চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে তখনই, যখন বিরোধীর দূতও তাঁর দরবারে এসে সম্মান পেয়েছে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিব






