আশুরার নামে যা বলা হয়, সব কি সত্য

প্রতীকী ছবি
ইসলামের ইতিহাসে মহররম একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস। এটি আল্লাহর সম্মানিত চার মাসের একটি এবং হিজরি বছরের প্রথম মাস। আশুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনটিও রয়েছে এ মাসেই। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মহররম যত না সহিহ বর্ণনা ও প্রামাণ্য শিক্ষার আলোকে আলোচিত হয়, তার চেয়ে বেশি আলোচিত হয় বিভিন্ন দুর্বল, ভিত্তিহীন ও জাল বর্ণনার মাধ্যমে। ফলে অনেক মুসলিমকে বিভ্রান্ত হতে দেখা যায়। ইসলামের প্রামাণ্য সত্যকে আড়াল করে ভিত্তিহীন লোককথা ও কুসংস্কারগুলো তাদের আদর্শে জায়গা করে নেয়।
অথচ মুসলিম স্কলাররা বারবার সতর্ক করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে মিথ্যা কথা প্রচার করা সবচেয়ে বড় অপরাধগুলোর একটি। নবী (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা কথা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৭)
মহররমকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বহু বর্ণনা এ সতর্কবাণীর আলোকে নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।
মহররম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাবিগুলোর একটি হলো, আশুরার দিনেই আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছে, নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে ভিড়েছে, ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হয়েছেন, আইয়ুব (আ.) রোগমুক্ত হয়েছেন এবং আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। এসব বর্ণনার কিছু বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশের সনদ অত্যন্ত দুর্বল, বিচ্ছিন্ন বা অপ্রমাণিত।
হাফিজ ইবনে কাসির (রহ.) আশুরাসংক্রান্ত অনেক প্রচলিত ঘটনার বর্ণনা উল্লেখ করে বলেছেন, এসবের অধিকাংশের নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড)
একইভাবে ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) এবং আল্লামা শাওকানি (রহ.) বহু আশুরাসংক্রান্ত বর্ণনাকে জাল বা অতি দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (আল-মাওদু‘আত, ইবনুল জাওজি; আল-ফাওয়াইদুল মাজমু‘আহ, শাওকানি)
মহররমকে কেন্দ্র করে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, আশুরার দিনে বিশেষ ধরনের নামাজ পড়লে বহু বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়, নির্দিষ্টসংখ্যক রাকাত আদায় করলে অগণিত নেকি পাওয়া যায়, অথবা বিশেষ দোয়া পাঠ করলে অলৌকিক ফল লাভ হয়। অথচ হাদিসবিশারদদের মতে, এ ধরনের অধিকাংশ বর্ণনার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, আশুরার দিনের বিশেষ নামাজ সম্পর্কে প্রচলিত হাদিসগুলো ভিত্তিহীন। (আল-মাজমু‘, ৪/৫৬)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজ, বিশেষ গোসল, বিশেষ সুরমা ব্যবহার বা বিশেষ ইবাদত সম্পর্কে যেসব হাদিস প্রচলিত আছে, তার অধিকাংশই মিথ্যা। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/২৯৯-৩১৩)
ভারত উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত একটি বিশ্বাস হলো, আশুরার দিনে ঘরে বিশেষ খাবার রান্না করলে বছরের জন্য বরকত নেমে আসে। কোথাও কোথাও ‘খিচুড়ি দিবস’, কোথাও ‘তাবারুক দিবস’ বা নির্দিষ্ট খাদ্য প্রস্তুতের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ধারণাও দেখা যায়। অথচ কোরআন-হাদিসে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই। ইসলাম আশুরার জন্য যে আমলকে সুস্পষ্টভাবে উৎসাহিত করেছে, তা হলো রোজা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২) এ হাদিসে রোজার কথা বলা হয়েছে, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়নি।
মহররমকে কেন্দ্র করে আরেকটি সমস্যা হলো, কারবালার ইতিহাসে অতিরঞ্জন। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী যুগে অসংখ্য কাল্পনিক কাহিনি, অতিরঞ্জিত বক্তব্য এবং সনদবিহীন বর্ণনা যুক্ত হয়েছে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেন, কারবালার ঘটনার বিবরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে অনেক মানুষ আবেগের কারণে এমন কিছু ঘটনা যুক্ত করেছেন, যার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৭২-২২০)
ড. আলী সাল্লাবি তার গবেষণাগ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, কারবালার ইতিহাসের ক্ষেত্রে আবু মিখনাফের মতো কিছু বর্ণনাকারীর প্রতিবেদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বহু দুর্বল তথ্য ইতিহাসে প্রবেশ করেছে। (Ali Muhammad al-Sallabi, Al-Hasan and Al-Husayn)
এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। কিছু মানুষ আশুরাকে শুধু শোকের দিন হিসেবে উপস্থাপন করেন, আবার অন্যরা একে শুধু আনন্দের দিন হিসেবে প্রচার করেন। অথচ সহিহ সুন্নাহর আলোকে আশুরার মূল আমল হলো রোজা রাখা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করা যেতে পারে, কিন্তু তা এমনভাবে করা যাবে না, যা শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, আশুরাকে কেন্দ্র করে দুটি চরমপন্থা সৃষ্টি হয়েছে। একদল একে শোক ও মাতমের দিনে পরিণত করেছে, আরেক দল এটিকে উৎসবের দিনে রূপ দিয়েছে। উভয় অবস্থানই সুন্নাহসম্মত নয়। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/২৯৯)
প্রকৃতপক্ষে মহররমের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সত্যের অনুসরণ। আর সত্যের অনুসরণ তখনই সম্ভব, যখন ধর্মীয় বর্ণনাগুলো আবেগ নয়, বরং দলিলের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে। কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে লোকমুখে প্রচলিত গল্প, অলৌকিক কাহিনি বা জাল হাদিসকে ধর্মের অংশ বানিয়ে ফেললে মানুষ মূল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।
মহররম আমাদের শুধু আশুরার রোজার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করারও শিক্ষা দেয়। তাই এ মাসে আমাদের দায়িত্ব হলো, প্রচলিত প্রতিটি বর্ণনাকে যাচাই করা, নির্ভরযোগ্য আলিমদের গবেষণার শরণাপন্ন হওয়া এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। কারণ ইসলামে আবেগের চেয়ে সত্য বড়, আর সত্যের ভিত্তি হলো কোরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য জ্ঞানচর্চা।
লেখক : শিক্ষার্থী এন আকন্দ কামিল মাদ্রাসা, নেত্রকোনা।




