আশুরার রোজা নিয়ে একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা

প্রতীকী ছবি
ইসলামের প্রতিটি ইবাদতের রয়েছে নির্ধারিত মর্যাদা ও ফজিলত। আল্লাহতাআলার নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো রোজা। আর মহররম মাসের দশম দিন আশুরার রোজা ইসলামের ইতিহাস ও আমলের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় মানুষের মধ্যে প্রচলিত কিছু বর্ণনা হাদিস হিসেবে উপস্থাপিত হয়, অথচ মুহাদ্দিসদের গবেষণায় সেগুলোর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। তাই দ্বীনের বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন এবং সহিহ ও দুর্বল বর্ণনার পার্থক্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখে, সে ষাট বছর দিনে রোজা ও রাতে ইবাদত করার সওয়াব লাভ করে।’ অনেক জায়গায় এটিকে হাদিস হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মুহাদ্দিসদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হাদিস নয়; বরং এটি একটি জাল (মওযূ) বর্ণনা।
হাদিস বিশারদরা এই বর্ণনার ব্যাপারে কঠোর মন্তব্য করেছেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেছেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে মওযূ বা জাল বর্ণনা।’ (আল-মাওযূআত, ২/২০৩)
এ বিষয়ে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘এটি একটি বাতিল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা। এটি হাবীব ইবনে আবী হাবীব নামক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে, আর সে হাদিস জাল করত।’ (আল-মানারুল মুনিফ, ১/৪৭, বর্ণনা নম্বর ৪৪)
পরবর্তী যুগের বিশিষ্ট মুহাদ্দিসরাও এই মতকে সমর্থন করেছেন। হাফেজ জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) এবং আল্লামা ইবনু আররাক (রহ.) এই বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা আবদুল হাই লখনবী (রহ.) আশুরার রোজার ফজিলত বিষয়ে জাল বর্ণনাগুলো আলোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। (আল-লাআলিল মাসনূআ, ১/১৩৫; তানযীহুশ শরিআহ, ২/১৪৮; আল-আসারুল মারফূআ, ১/৯৪)
তবে আশুরার রোজার ফজিলত নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সুস্পষ্ট ও সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ»
অর্থাৎ, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহতাআলা বিগত এক বছরের (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, ১/৩৬৭; জামে তিরমিজি, ১/১৫৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আশুরার রোজা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নফল ইবাদত। এর মাধ্যমে আল্লাহতাআলা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছরের ছোটখাটো গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। এটি কোনো দুর্বল বা ভিত্তিহীন বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
দ্বীনের বিষয়ে সতর্কতা হলো, কোনো আমলের ফজিলত বর্ণনা করার আগে তার উৎস যাচাই করা। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে এমন কোনো কথা প্রচার করা, যা তিনি বলেননি, তা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৭; মুসলিম, হাদিস : ৩)
তাই আশুরার রোজার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত সহিহ হাদিসের ওপর নির্ভর করা।
লেখক : শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদ্রাসা, নেত্রকোনা।




