রোদের শহরে মানবতার পরীক্ষা
- গরমের এই সময়ে ইসলামের মানবিক বার্তা
- গরমের শহরে এক বোতল পানির মহত্ব

প্রখর রোদে পুড়ছে শহর। দুপুরের আগেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ব্যস্ত সড়ক। তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। কোথাও হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর খবর, কোথাও পানিশূন্যতায় অসুস্থ শ্রমিক। কিন্তু এই জ্বলন্ত শহরের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো, সবাই সমানভাবে গরমের কষ্ট ভোগ করে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থাকা মানুষ আর পিচঢালা উত্তপ্ত সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিকশা চালানো মানুষের কষ্ট এক নয়। একজন অফিস শেষে ঠান্ডা পানীয় পান করেন, আরেকজন রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানির জন্য অপেক্ষা করেন। ঠিক এখানেই মানবতার পরীক্ষা।
ইসলাম মানুষের কষ্টকে শুধু অনুভব করতে বলেনি; বরং সেই কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসাকেও ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনের তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
আজকের এই দাবদাহে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত মানুষকে এক বোতল পানি দেওয়া, শ্রমিকের জন্য সামান্য ছায়ার ব্যবস্থা করা কিংবা ক্লান্ত পথচারীকে একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়াও বড় ইবাদত হতে পারে। কারণ ইসলামে ইবাদত কেবল মসজিদকেন্দ্রিক নয়; বরং মানুষের উপকার করাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা আল-ইনসান, আয়াত : ৮)
এই আয়াতের মর্ম শুধু খাদ্যদান নয়; বরং অসহায় মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো। আজকের শহরে হয়তো বন্দি নেই, কিন্তু রোদের নির্মমতায় আটকে পড়া অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ আছে, যাদের কষ্ট আমরা প্রতিদিন দেখেও অনেক সময় অনুভব করি না।
ইসলামের ইতিহাসে
তৃষ্ণার্ত প্রাণীর প্রতিও দয়ার অসাধারণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)
বলেছেন, এক
ব্যক্তি পথ চলতে গিয়ে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কষ্ট পাচ্ছিল। একটি কূপ থেকে পানি পান করার
পর সে দেখতে পেল, একটি কুকুর তৃষ্ণায় মাটি চাটছে। তখন সে নিজের জুতা দিয়ে
পানি তুলে কুকুরটিকে পান করায়। আল্লাহ তার এই কাজের কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন।
(বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)
যে ধর্ম তৃষ্ণার্ত পশুকে পানি পান করানোকে জান্নাত লাভের কারণ বানায়, সে ধর্মে রোদের মধ্যে কষ্ট করা মানুষের প্রতি উদাসীনতা কখনো কাম্য হতে পারে না।
আজ শহরের বিভিন্ন স্থানে কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় ঠান্ডা পানি বিতরণ করছেন, কেউ লেবুর শরবত দিচ্ছেন, কেউ পথচারীদের জন্য অস্থায়ী পানির ব্যবস্থা করছেন। এসব কাজ সামাজিক দৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম সদকা হলো পানি পান করানো।’ (নাসাঈ, হাদিস : ৩৬৬৪; মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ২৩৯০৩)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। নগরায়ন, গাছপালা কমে যাওয়া ও কংক্রিটনির্ভর শহর মানুষকে আরও বিপদে ফেলছে। অথচ ইসলাম পরিবেশ ও ছায়া সৃষ্টির প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে, এরপর মানুষ বা প্রাণী তা থেকে উপকৃত হয়, তবে তা তার জন্য সদকা।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩২০)
অর্থাৎ একটি গাছও হতে পারে মানুষের জন্য রহমতের ছায়া।
এই গরমে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয় শ্রমজীবী মানুষ। নির্মাণশ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী, রিকশাচালক, কৃষক ও ট্রাফিক পুলিশদের কষ্ট অনেক সময় আমাদের চোখে পড়ে না। ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩)
এই হাদিস শুধু বেতন দেওয়ার নির্দেশ নয়; বরং শ্রমিকের কষ্ট ও মানবিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা।
আজকের শহরে মানবতার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত অনুভূতির সংকট। মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হচ্ছে, কিন্তু অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অথচ একজন মুমিনের পরিচয়ই হলো দয়া ও সহমর্মিতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)
তাই এই দাবদাহ শুধু আবহাওয়ার সংকট নয়; এটি মানবতারও পরীক্ষা। আমরা কি শুধু নিজের আরাম নিয়ে ব্যস্ত থাকব, নাকি তৃষ্ণার্ত মানুষটির দিকে এক বোতল পানি বাড়িয়ে দেব? আমরা কি গরমকে কেবল বিরক্তি হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করব?
রোদের এই শহরে হয়তো বড় বড় দালান মানুষকে ছায়া দিতে পারে না। কিন্তু একটি সহানুভূতিশীল হৃদয় পারে ক্লান্ত মানুষকে সামান্য স্বস্তি দিতে। আর ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের প্রতি দয়া কখনো বিফলে যায় না; তা একদিন আল্লাহর রহমত হয়ে ফিরে আসে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




