কোরআন যাদের থেকে দূরে থাকতে বলেছে

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবন শুধু দুনিয়ার কয়েকটি দিনের সমষ্টি নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান, আর আখিরাত হলো চূড়ান্ত পরিণতির আবাস। একজন মুমিনের চিন্তা, কর্ম, সম্পর্ক ও জীবনদর্শনের ওপর আখিরাতের বিশ্বাস গভীর প্রভাব ফেলে। এ কারণেই কোরআন বারবার মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরিবর্তে অনন্ত জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَوَلَّوۡا قَوۡمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیۡهِمۡ قَدۡ یَئِسُوۡا مِنَ الۡاٰخِرَۃِ كَمَا یَئِسَ الۡكُفَّارُ مِنۡ اَصۡحٰبِ الۡقُبُوۡرِ
‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছে, যেমন হতাশ হয়েছে কাফিররা কবরবাসীদের বিষয়ে।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত : ১৩)
আয়াতটির শুরুতেই মুমিনদের সম্বোধন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর প্রতি ঈমান শুধু মুখের স্বীকৃতি নয়; বরং ঈমান মানুষের মূল্যবোধ ও আনুগত্যের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। একজন মুমিনের ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও আদর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিই চূড়ান্ত মানদণ্ড। তাই যারা আল্লাহর অবাধ্যতা ও সত্য প্রত্যাখ্যানের পথে অটল, তাদের এমনভাবে অনুসরণ বা অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তা মুমিনের ঈমান ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়।
তবে এই আয়াতকে অন্য ধর্মাবলম্বী বা ভিন্নমতের সব মানুষের প্রতি অন্যায়, ঘৃণা কিংবা শত্রুতার অনুমতি হিসেবে বোঝার সুযোগ নেই। কোরআন স্পষ্টভাবে বলেছে,
لَا یَنۡهٰىكُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یُقَاتِلُوۡكُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَ لَمۡ یُخۡرِجُوۡكُمۡ مِّنۡ دِیَارِكُمۡ اَنۡ تَبَرُّوۡهُمۡ وَ تُقۡسِطُوۡۤا اِلَیۡهِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ
‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।’ (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)
ইসলাম ন্যায়বিচারকে সর্বাবস্থায় অপরিহার্য করেছে। প্রবন্ধে প্রথমোক্ত আয়াতটির মূল সতর্কতা হলো এমন অন্তরঙ্গ আনুগত্য ও আদর্শিক সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকা, যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আয়াতের শেষাংশে আখিরাত সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের মানসিকতার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তারা কবরবাসীদের পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবনের ব্যাপারে যেমন আশাহীন, তেমনি আখিরাতের বাস্তবতা অস্বীকার করে। অথচ মুমিনের বিশ্বাস হলো, মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি নয়। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; তারপর তোমাদের আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৫৭)
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল করে। সে জানে, দুনিয়ায় গোপনে করা কোনো কাজই আল্লাহর কাছে গোপন নয়। মানুষের কাছ থেকে লুকানো অন্যায়ও কিয়ামতের দিন প্রকাশিত হবে। তাই মুমিন অন্যায় উপার্জন, জুলুম, প্রতারণা ও পাপ থেকে নিজেকে সংযত রাখে। বিপদে হতাশ হয় না, কারণ সে জানে দুনিয়ার কষ্ট চিরস্থায়ী নয়। আবার সুখ-সমৃদ্ধিতেও সীমালঙ্ঘন করে না, কারণ সে জানে সবকিছুর হিসাব দিতে হবে।
আসলে আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস একজন মানুষের দৃষ্টিকে দুনিয়ার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে। সে সাময়িক লাভের চেয়ে চিরস্থায়ী সফলতাকে প্রাধান্য দেয়। তাই আয়াতটি শুধু একটি সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্কতা নয়; এটি মুমিনের জীবনদর্শনের একটি মৌলিক শিক্ষা। দুনিয়ার মোহ নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতাই হবে তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। যে হৃদয়ে আখিরাতের বিশ্বাস জীবন্ত থাকে, তার কাছে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কখনো জীবনের চূড়ান্ত হিসাব হয়ে ওঠে না।



