আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম যেসব দোয়া করতেন

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে দোয়া হচ্ছে মহান আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ, তাঁর রহমতের প্রত্যাশা এবং নিজের অসহায়ত্ব স্বীকারের এক অনন্য ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলদের বহু দোয়া তুলে ধরেছেন। এসব দোয়ায় কখনো বিপদ থেকে মুক্তির আকুতি, কখনো ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা, কখনো পরিবার ও সন্তানদের কল্যাণ কামনা, আবার কখনো দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের মিনতি প্রকাশ পেয়েছে। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের এসব দোয়া শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রার্থনা নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য অনুসরণীয় শিক্ষা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথনির্দেশ।
আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) ভুলের পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে যে দোয়া করেছিলেন, তা তাওবা ও অনুশোচনার অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন—
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ২৩)
এই দোয়ায় রয়েছে নিজের ভুল স্বীকার, আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশা এবং তাঁর রহমতের প্রতি গভীর নির্ভরতা। মুমিনের উচিত ভুল হয়ে গেলে অহংকার বা অজুহাতের আশ্রয় না নিয়ে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।
নুহ (আ.) দীর্ঘদিন তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন। নিজের, মা-বাবা এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি দোয়া করেছিলেন—
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের ক্ষমা করুন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ২৮)
এ দোয়া আমাদের শেখায়, একজন মুমিনের প্রার্থনা কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মা-বাবা, পরিবার এবং সমগ্র মুমিন সমাজের কল্যাণ কামনাও তার ইবাদতের অংশ।
বিপদ-আপদে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আইয়ুব (আ.)। দীর্ঘ অসুস্থতা ও পরীক্ষার মুখেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। নিজের কষ্টের কথা আল্লাহর কাছে নিবেদন করে তিনি বলেছিলেন—
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হয়েছি, আর আপনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)
এ দোয়ায় কষ্টের কথা আছে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি অভিযোগ নেই; আছে তার অসীম দয়ার প্রতি আস্থা। অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা কিংবা সংকটে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য এটি গভীর আশাবাদের শিক্ষা বহন করে।
মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দায়িত্ব পালনের শক্তি ও কাজ সহজ হওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। ফিরআউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর বিখ্যাত দোয়া ছিল—
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ (সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ২৫-২৮)
কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, বক্তব্য কিংবা দায়িত্ব পালনের আগে এই দোয়া পাঠ করা যায়। এটি মানসিক প্রশান্তি, কাজের সহজতা এবং বক্তব্যের স্পষ্টতার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দেয়।
ইবরাহিম (আ.) নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের কল্যাণ কামনা করতেন। তিনি আল্লাহর কাছে নামাজ প্রতিষ্ঠা এবং সন্তানদের নেককার হওয়ার তাওফিক চেয়ে দোয়া করেন—
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪০)
এ দোয়া থেকে বোঝা যায়, নিজের ইবাদতের পাশাপাশি সন্তানদেরও নামাজি ও আল্লাহর অনুগত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রার্থনা করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ইউসুফ (আ.) আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর কাছে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি বলেন—
تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
অর্থ: ‘আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং নেককারদের সঙ্গে মিলিত করুন।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০১)
জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু দুনিয়ার অর্জনে নয়, বরং ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করতে পারার মধ্যেও নিহিত। তাই একজন মুমিনের প্রার্থনায় উত্তম পরিণতির আকাঙ্ক্ষা থাকা প্রয়োজন।
ইউনুস (আ.) মাছের পেটের অন্ধকারে বিপন্ন অবস্থায় আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন, তা বিপদমুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হিসেবে পরিচিত—
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
পরের আয়াতে আল্লাহ জানান, তিনি ইউনুস (আ.)-এর দোয়া কবুল করেন এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন। অতঃপর বলেন, ‘এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৮)
এ দোয়ার মধ্যে তাওহিদ, আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা এবং নিজের ত্রুটি স্বীকারের সমন্বয় ঘটেছে। বিপদে পড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য এটি মুমিনদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
শুআইব (আ.) সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা প্রকাশ করে বলেছিলেন—
عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنْتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ
অর্থ: ‘আমরা আল্লাহর ওপরই নির্ভর করেছি। হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে মীমাংসা করে দিন। আপনিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।’ (সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৮৯)
এ দোয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা এবং বিরোধের মীমাংসায় আল্লাহর সাহায্য কামনার শিক্ষা দেয়।
নবী-রাসুলদের এসব দোয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের সমন্বয়। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বহুল পঠিত একটি দোয়া পবিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২০১)
সহিহ বুখারি (হাদিস: ৬৩৮৯) ও সহিহ মুসলিমে (হাদিস: ২৬৯০) আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি করতেন। দোয়াটি দুনিয়ার কল্যাণ, আখিরাতের মুক্তি এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণের সার্বিক প্রার্থনা।
আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের দোয়াগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের প্রার্থনায় ছিল আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, নিজের অসহায়ত্বের স্বীকৃতি, বিপদে ধৈর্য, পরিবার ও সমাজের কল্যাণ এবং আখিরাতের সফলতার আকাঙ্ক্ষা। এসব দোয়া আমাদের শুধু মুখে উচ্চারণ করার জন্য নয়; বরং অন্তরে ধারণ করে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়। তাই দৈনন্দিন জীবনে কোরআনে বর্ণিত এসব দোয়া অর্থ বুঝে পাঠ করা এবং এর শিক্ষা অনুসারে জীবন গড়ার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য কল্যাণকর।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



