আখিরাতের চিন্তায় আমরা কতটা জাগ্রত?

প্রতীকী ছবি
মানুষ ভবিষ্যতের জন্য কত কিছুই না করে। সন্তানের ভবিষ্যৎ, চাকরির ভবিষ্যৎ, ব্যবসার ভবিষ্যৎ, বার্ধক্যের ভবিষ্যৎ; সবকিছুর জন্য তার পরিকল্পনা থাকে। কেউ বাড়ি বানায়, কেউ সঞ্চয় করে, কেউ সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থ জমায়। অথচ যে ভবিষ্যৎ অনিবার্য এবং যার পরিসর চিরস্থায়ী, সেই আখিরাতের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَا رَأَيْتُ مِثْلَ النَّارِ نَامَ هَارِبُهَا وَلاَ مِثْلَ الْجَنَّةِ نَامَ طَالِبُهَا " .
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জাহান্নামের মতো এমন কিছু দেখিনি, যা থেকে আত্মরক্ষাকারীরা ঘুমে অচেতন; আর জান্নাতের মতো এমন কিছুও দেখিনি, যার অন্বেষণকারীরাও ঘুমে অচেতন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৬০১)
হাদিসে ‘ঘুম’ শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এটি উদাসীনতা ও গাফিলতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। যে ব্যক্তি জানে সামনে ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে, সে কি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে? আর যে জানে সামনে এমন জান্নাত রয়েছে, যার সুখের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো সুখের তুলনা চলে না, সে কি তার সন্ধানে উদাসীন থাকতে পারে?
কোরআন মুমিনদের সতর্ক করে বলেছে, “প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।” (সুরা হাশর, আয়াত : ১৮) এখানে ‘আগামী দিন’ বলতে আখিরাতের জীবনকে বোঝানো হয়েছে। আয়াতটি যেন প্রতিদিনের জীবনে একটি আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি করে: আজ আমি কী পাঠালাম আমার সেই দিনের জন্য, যেদিন অর্থ, পদ, পরিচয় কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনো কাজে আসবে না?
আমাদের জীবনের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, দুনিয়ার সামান্য ক্ষতি নিয়ে আমরা যতটা উদ্বিগ্ন, আখিরাতের ক্ষতি নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নই। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাত জাগতে পারি, ব্যবসার হিসাব মেলাতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারি, গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ঘুম ত্যাগ করতে পারি। অথচ ফজরের নামাজের সময় ঘুম ভাঙে না। দুনিয়ার একটি সুযোগ হাতছাড়া হলে মন খারাপ হয়, কিন্তু প্রতিদিন কত সুযোগ যে নেক আমল ছাড়াই চলে যাচ্ছে, তার হিসাব রাখি না।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের সমান।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩) এখানে শুধু জান্নাতের কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা। অর্থাৎ জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা একজন মুমিনের জীবনে এমন কর্মপ্রেরণা তৈরি করবে; যেগুলো তার জান্নাত প্রপ্তিতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে জাহান্নামের ভয় মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর।” (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)
এই ভয় হতাশার জন্য নয়; বরং সংশোধনের জন্য। একজন মুমিন জাহান্নামকে ভয় করবে, কিন্তু সেই ভয় তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করবে না। একইভাবে জান্নাতের আশা তাকে অলসও করবে না; বরং আমলের দিকে এগিয়ে নেবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ
‘সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নাফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
তাই আখিরাতের চিন্তায় জাগ্রত থাকার অর্থ সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকা নয়। এর অর্থ হলো জীবনের সিদ্ধান্তগুলোতে আখিরাতকে উপস্থিত রাখা। উপার্জনের সময় হারাম থেকে বেঁচে থাকা, ব্যবসায় প্রতারণা না করা, মানুষের হক নষ্ট না করা, পরিবারকে সময় দেওয়া, গোপনে সৎকাজ করা, গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করা এবং নামাজকে জীবনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা—এসবই আখিরাতের জন্য জেগে থাকার লক্ষণ।
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে যদি মানুষ নিজেকে মাত্র কয়েকটি প্রশ্ন করে; আজ আমি কাকে কষ্ট দিয়েছি? কার হক নষ্ট করেছি? কোন গুনাহ করেছি? কী ভালো কাজ করেছি? আল্লাহর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজ কেমন ছিল? তাহলে আত্মশুদ্ধির একটি দরজা খুলে যেতে পারে।
দুনিয়ার ঘুম আমাদের শরীরকে বিশ্রাম দেয়। কিন্তু আখিরাতের ব্যাপারে গাফিলতির ঘুম মানুষকে ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসটি আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় তাকিয়ে প্রত্যেকের নিজের কাছেই প্রশ্ন করা উচিত—
আমি জানি জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, মৃত্যু সত্য এবং আখিরাতও সত্য। কিন্তু আমার জীবনযাপন কি সেই বিশ্বাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে?
আখিরাতের চিন্তায় জাগ্রত হওয়া মানে দুনিয়া ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং দুনিয়ার প্রতিটি কাজকে আখিরাতের প্রস্তুতির অংশে পরিণত করা। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হবে, আমরা কত দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছি তা নয়; বরং সেই জীবন দিয়ে আগামী জীবনের জন্য কী পাঠিয়েছি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



