বৃদ্ধ পিতা-মাতার কান্নায় ভিজছে আধুনিক সমাজ
- বাবা-মায়ের দোয়া হারাচ্ছে যে প্রজন্ম
- বৃদ্ধ পিতা-মাতার পাশে দাঁড়াতে শিখছে না সমাজ

প্রতীকী ছবি
একসময় বাংলার ঘরে ঘরে দিনের শুরু হতো মা-বাবার দোয়া নিয়ে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সন্তানের মাথায় হাত রেখে মা বলতেন, ‘আল্লাহ হেফাজত করুক।’ বাবা নীরবে সন্তানের সফলতার জন্য দোয়া করতেন। সেই দোয়ার ভেতরে ছিল ভালোবাসা, নিরাপত্তা, আধ্যাত্মিক শক্তি ও জীবনের বরকত। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তি, ব্যস্ততা ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনের ভিড়ে আজ অনেক সন্তান ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে পিতা-মাতার সেই আন্তরিক দোয়া। বৃদ্ধ পিতা-মাতার নিঃসঙ্গতা বাড়ছে, আর সন্তানের জীবন থেকেও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে প্রশান্তি ও বরকতের ছায়া।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা এত উচ্চ যে, আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরই তাঁদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা কেবল তারই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
এই আয়াত শুধু ভদ্র আচরণের শিক্ষা নয়; এটি মানুষের নৈতিক সভ্যতার মানদণ্ড। ইসলাম বুঝিয়েছে, পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা আসলে আত্মিক অবক্ষয়ের লক্ষণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৯৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’ (নাসাঈ, হাদিস : ৩১০৪)
এই শিক্ষাগুলো শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়; এগুলো পরিবার টিকিয়ে রাখার মৌলিক নীতি। কারণ যে সন্তান পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখে না, সে সমাজ ও মানবতার প্রতিও দায়িত্বশীল হতে পারে না।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা উদ্বেগজনক। বৃদ্ধাশ্রমে বাড়ছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। অনেক পিতা-মাতা সন্তান থাকা সত্ত্বেও একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ মাসের পর মাস সন্তানের ফোন পান না। কেউ চিকিৎসার খরচের জন্য অপেক্ষা করেন, কেউ শুধু একটু সময় ও কথা বলার মানুষ খোঁজেন। অথচ সেই সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে এই পিতা-মাতারাই নিজেদের জীবন-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা অবশ্যই বাস্তবতা। কর্মসংস্থান, প্রবাস, নগরজীবনের চাপ সবই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যস্ততা কি দায়িত্ববোধকে মুছে দিতে পারে? ইসলাম কখনো ক্যারিয়ার বা উন্নতির বিরোধিতা করেনি। বরং ইসলাম এমন উন্নতি চায়, যেখানে পরিবার ভেঙে পড়ে না, বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখ ভেজে না।
বর্তমান সমাজে আরেকটি ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক সন্তান মনে করেন, টাকা পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। অথচ পিতা-মাতা শুধু অর্থ চান না; তাঁরা চান সম্মান, সময়, খোঁজখবর ও মানসিক সঙ্গ। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের একটি ফোন, একটি আন্তরিক কথা, একটি পাশে বসা অনেক সময় ওষুধের চেয়েও বড় প্রশান্তি হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরাও বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্ব মানুষের শারীরিক অসুস্থতার মতোই ভয়াবহ। দীর্ঘদিন মানসিক অবহেলায় থাকা প্রবীণদের মধ্যে হতাশা, বিষণ্নতা ও মৃত্যুহার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা শুধু ধর্মীয় ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিক ও সামাজিক সংকটও।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়ন করেছে। এই আইনে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রও বুঝেছে, শুধু নৈতিক শিক্ষা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। আইন করে হলেও সন্তানদের দায়িত্বশীল করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দায়িত্ব ভালোবাসা ও ঈমান থেকে আসার কথা ছিল, সেটি কেন আদালত ও আইনের বিষয় হয়ে দাঁড়াল?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা কমে যাচ্ছে। শিশুদের বড় করা হচ্ছে প্রতিযোগিতা শেখিয়ে, কিন্তু কৃতজ্ঞতা শেখানো হচ্ছে না। তাদের শেখানো হচ্ছে সফল হতে, কিন্তু শেখানো হচ্ছে না কার কাঁধে ভর করে সে এখানে পৌঁছেছে। ফলে সমাজে ধীরে ধীরে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ কিন্তু সম্পর্ক রক্ষায় দুর্বল।
ইসলামে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করাকেও ইবাদত হিসেবে দেখা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা শিখিয়েছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৪)
যে সন্তান নিজের পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে না, খোঁজ নেয় না, তাদের কষ্ট বোঝে না, সে আসলে নিজের ভবিষ্যতের জন্যও অন্ধকার তৈরি করে। কারণ জীবন চক্রাকারে ফিরে আসে। আজ যে সন্তান পিতা-মাতাকে অবহেলা করছে, আগামী প্রজন্ম তার কাছ থেকেও একই আচরণ শিখবে।
আমাদের সমাজে উন্নয়ন হচ্ছে, উঁচু দালান উঠছে, আয় বাড়ছে; কিন্তু যদি বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখে অশ্রু জমে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। ইসলাম এমন সমাজ চায়, যেখানে বৃদ্ধরা বোঝা নয়, বরং সম্মানের প্রতীক হবেন। যেখানে সন্তানের ব্যস্ততা থাকবে, কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য সময়ও থাকবে। যেখানে বৃদ্ধাশ্রমের চেয়ে ঘরের এক কোণে বাবা-মায়ের হাসিমুখ বেশি মূল্যবান হবে।
একটি জাতির নৈতিক শক্তি বোঝা যায় তারা তাদের বৃদ্ধদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। যে প্রজন্ম বাবা-মায়ের দোয়া হারায়, তারা ধীরে ধীরে জীবনের সবচেয়ে বড় বরকতও হারিয়ে ফেলে। তাই সময় থাকতে আমাদের ফিরে আসতে হবে পারিবারিক দায়িত্ববোধ, ইসলামী মূল্যবোধ ও মানবিকতার সেই চিরন্তন শিক্ষায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




