এই লেখা আপনি পড়বেন কি না জানি না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘুম এসে যায় আমাদের সবার, ঠিক দুপুরবেলা, আহার শেষেই। শরীরটা কেমন যেন হয়ে ওঠে— আয়েসি; বিছানা টানে, মন সায় দেয় চুপিচুপি। কিন্তু আপনি নিজ হাতে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, দুপুরে। রাজধানী ঢাকাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ‘ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ার শুদ্ধ সাধ আপনার। ঘুরে দেখতে চাইলেন ঢাকা উত্তর সিটিটা।
অথচ দিনটি ছিল শুক্রবার, ছুটির দিন। পৃথিবীর তাবৎ স্ত্রী এবং সন্তানের এরকম দিনে চাওয়া থাকে একটাই— একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, আনন্দে কোনো মুভি দেখা। তারপর সন্ধ্যায় বেড়ানো, কাছে-পিঠে কোনো পরিচিত-অপরিচিত ভুবনে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ধন্যবাদ।
০২
পরিদর্শনের অনেক রুটের মধ্যে মিরপুরের সম্ভ্রান্ত এলাকা ডিওএইচএসে এসেছিলেন আপনি, এসেছিলেন শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০-এও। আপনার মনে হতে পারে, মাত্র এ কটি জায়গার কথাটা উল্লেখ করলাম কেন আমি? মানুষের কাছে সেটাই সত্য, যা সে দেখে, চোখ বরাবর তার কাছে যা দৃশ্যমান।
আমি এ জায়গাগুলো প্রতিনিয়ত দেখি, আমার যাতায়াতের সীমানা এখানেই।
০৩
আরও একবার আমন্ত্রণ আপনাকে প্রধানমন্ত্রী, আমাদের মিরপুরে।
০৪
আমন্ত্রণ রক্ষা করে একদিন সত্যি সত্যি মিরপুরে এলেন আপনি। আপনাকে প্রথমেই নিয়ে যাব ডিওএইচএসে। বাম পাশে তাকালেই দেখতে পাবেন মিরপুর ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাড়ে সাত হাজার ছাত্রছাত্রীর বিদ্যানিকেতন এটা।
আপনাকে নিয়ে যাব ঠিক স্কুল ছুটির ক্ষণে। মিরপুর-১২ নম্বরে ডান দিকে, যে পল্লবী এলাকাটা আছে, যেখানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকশ ছাত্রছাত্রীর বাস, তবে তারা সরাসরি যেতে পারে না তাদের আবাসে। আরও প্রায় এক কিলোমিটার সামনে গিয়ে ঘুরে, ডান দিকে ইউটার্ন নিয়ে আসতে হয় তাদের। অল্প কিছু মানুষের গাড়ি আছে, অধিকাংশেরই বাহন রিকশা। বাস, ব্যাটারিচালিত যান আর এটা-ওটা জড়ো করে রাখা স্তূপ পেরিয়ে বাড়ি পৌঁছতে হয় তাদের প্রতিদিন। এ জায়গার রাস্তাগুলো অদ্ভুত এক পাজলে রূপ নিয়েছে, সহজে চলা যায় না, পেরোনো যায় না এপাশ থেকে ওপাশ। নেই কোনো ফুটওভার ব্রিজ। আপনি নিশ্চিত থাকুন প্রধানমন্ত্রী, এখানে যেকোনো দিন, যেকোনো সময় এক মায়ের হাত ধরে চলা ছাত্র কিংবা ছাত্রী গুরুতর জখম হবে, কিংবা...। র্যাডিসনের সামনে দুই ছাত্রের মারা যাওয়ার পর যেমন আন্দোলন হয়েছিল, তেমনি হবে একদিন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কে বা কারা এ জটিল পথ সৃষ্টি করেছে, কারা প্রতিনিয়ত এই মৃত্যুফাঁদ পেতেছে অজ্ঞতায়?
আমরা জানি না, জানার উপায় নেই আমাদের। আমরা শুধু জানি— আমাদের অনিশ্চয়তা, আমাদের শঙ্কা, আমাদের উদ্বিগ্নতা।
০৫
মিরপুর-১২ নম্বরের তিন রাস্তার মোড়ে এসে একটু থামতে অনুরোধ করব আপনাকে। প্রথমে বাম পাশে তাকাবেন— সিরামিক ইট কারখানার সামনের রাস্তায় শত শত বাস দাঁড় করানো, বিভিন্ন কোম্পানির; রাতেও এমন, দিনেও। কিছু বাস এমনভাবে রাস্তার মোড়ে রাখা হয়, মোড় পেরোনোর সময় ওপাশ থেকে আসা ছুটন্ত গাড়ি দেখা যায় না মোটেও।
ডান পাশে তাকাবেন তারপর। কিছুটা চমকে উঠবেন সঙ্গে সঙ্গে। রাস্তার পাশে সারি সারি প্রাইভেট কার দাঁড়ানো দেখে বিভ্রম হবে আপনার— এটা কি গাড়ি বেচাকেনার কোনো হাট? দৃষ্টি আরও একটু স্থির হতেই আপনি বুঝে যাবেন— পাশের সারি সারি বিপণিবিতানে আসা কাস্টমারদের গাড়ি এগুলো। বড় বড় সুউচ্চ দালান; কিন্তু গাড়ি পার্ক করার কোনো স্থান নেই তাতে!
০৬
কালশী রোডে নিয়ে যাব আপনাকে তারপর। চমকানোর দ্বিতীয় পালা শুরু হবে— আরে, পুরান ঢাকার জিনজিরা এলো কোথা থেকে এখানে! দুই রাস্তার দুই ফুটপাত তো দখল হয়েছেই, মূল রাস্তার অনেকটাতে ঠাঁই পেয়ে পুরনো লোহার জানালা, দরজা, গ্রিল, সিঁড়ি, পাইপ, ধারালো যন্ত্রপাতি!
হাঁটা তো দূরের কথা, পা রাখার জায়গা নেই। এই কি পাবলিকপ্লেস, নির্বিঘ্নে হেঁটে চলার সাধারণ মানুষের ফুটপাত!
০৭
আপনাকে এবার রাস্তাগুলোর দিকে তাকাতে অনুরোধ করব। কদিন আগে উপর্যুপরি বৃষ্টি হয়েছে; কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই খাবলা খাবলা করে উঠে যায় রাস্তার চামড়া। আচ্ছা, দুই-তিন বছর পর কেন রাস্তাগুলোর এমন দশা হয়? আমাদের টাকা কি এত সস্তা হয়ে গেছে, মান নেমে গেছে এত নিচে?
একটা দেশের একটা রাস্তা, দুই বছরও টেকে না! এটা কার দোষ? সম্ভবত আমাদের কপালের।
০৮
বাম দিকে গাড়ি ঘোরালেই ডান পাশে বেগুনটিলা বস্তি। জায়গাটার সংস্কার হওয়া দরকার। ডান দিকে তাকালে বিহারি ক্যাম্প, মেরামত দরকার এটারও, জরুরি। তারপর আরও একটু এগোলেই সাগুফতা, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা এক খাল, সে খাল দিয়ে ঢাকা শহরের প্রায় অধিকাংশ পানি পার হয়ে যায় তুরাগ নদে।
কদিন আগের বৃষ্টির প্রবল দাপটে উপচে গিয়েছিল এই খাল, পানির নিচে গিয়েছিল আশপাশে বাস করা মানুষের খাট-ফ্রিজ, চেয়ার-টেবিল।
খালের ওপর দিয়ে নতুন একটা ব্রিজ হচ্ছে, তার ডান পাশের রাস্তায় একটা মসজিদ হয়েছে দোতলা, তার পশ্চিমে ছায়ায় বসতে বলব আপনাকে। আপনি বসবেন। গল্প শুরু করবে আমাদের কেউ কেউ— জানেন, এই কদিন আগেও মিরপুরের মানুষজন ফার্মগেট আর গুলিস্তানকে বলত— ঢাকা। সেই ঢাকা থেকে হলুদ রঙের স্কুটার আসতে চাইত না মফস্বলরূপী মিরপুরে! অথচ আমাদের এই মিরপুরে দেশের সবচেয়ে বড় বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে, আছে সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা। ক্রিকেট খেলার স্টেডিয়াম আছে, ইনডোর স্টেডিয়াম। বেনারসি-জামদানিসহ দেশের সেরা শাড়ির মার্কেট আছে— বেনারসিপল্লী। সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমআইএসটি, ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিইউপি, হারম্যান মেইনার, মনিপুর স্কুল-কলেজ, কমার্স কলেজ আছে, আদিবাসীদের স্কুল বনফুল আছে। আছে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, আছে ইউনানি হাসপাতাল, দাঁতের হাসপাতালসহ অনেক হাসপাতাল। আমাদের এখানে একটা ক্যান্টনমেন্ট আছে। সবচেয়ে সহজ ও আরামদায়ক যাতায়াতব্যবস্থা মেট্রোরেল আছে। এখানে বধ্যভূমিও আছে একটা। দেশের সবচেয়ে বড় কম্পিউটার মার্কেট আছে। সামরিক জাদুঘর আছে। দেশের অন্যতম বাসস্ট্যান্ড গাবতলী বাসস্ট্যান্ড আছে।
আরও কত কি আছে এই মিরপুরে!
০৯
গল্প শেষে মিরপুরের শওকতের কাবাব নয়, রাব্বানীর সেরা গরুর মাংস দিয়ে ভাতও নয়, আবেশের নানরুটি-চাপও নয়, দামি গাড়ি থামিয়ে খাওয়া বিহারিদের বানানো ভুঁড়ি ভাজা আর পোড়া মাংসও নয়, সাগুফতার মোড়ে এক মামুলি চায়ের দোকানের লেবু চা খাওয়াব আপনাকে।
চা খেতে খেতে আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন— পাশের এই খালটা নির্মাণ ও ক্লিন দরকার আগে, ঢাকা শহর তাহলে আর সহজে ডুববে না সামান্য বৃষ্টিতে। ক্লিন করা দরকার ফুটপাত, বাস দখল করা রাস্তা, মার্কেটের গাড়ি পার্কিংয়ের নিচতলা, যততত্র জমাট বাঁধা ডিশ আর ইন্টারনেটের লাইন, ব্যাটারিচালিত রিকশা, হঠাৎ হঠাৎ গজে ওঠা দলীয় কার্যালয়।
‘আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি।’ সদ্য বলা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এ কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাই। আমরা সত্যিকারের প্রমাণ চাই তার পরের বাক্যটার— ‘শুধু পরিবর্তন দেখছি একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবশেষে আপনাকে পৃথিবীর সেরা অনুপ্রেরণাদায়ক ও নিজেকে জাগানো বাক্য শোনাতে চাই— Yesterday I was clever, so I wanted to change the world. Today I am wise, so I am changing my self. সুফি কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ বালখী রুমি বলেছেন কথাটা।
আপনি এও জানেন প্রধানমন্ত্রী— পরিবর্তনটা শুরু করতে হয় প্রথমত নিজের মাঝে, ব্যক্তির মাঝে; তবেই দেশের পরিবর্তন, জাতির পরিবর্তন, সাধারণ মানুষের সাধারণ ভাগ্যের পরিবর্তন।
গত ৫৫ বছরে যে পরিবর্তনটা আমরা চাতক পাখির মতো খঁুজছি!




