শান্তিময় সমাজ গঠনের দুটি মৌলিক ভিত্তি

প্রতীকী ছবি
মানুষ সামাজিক জীব। একা বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, নিরাপত্তাবোধ ও মানবিক সম্পর্কের ওপরই টিকে থাকে সমাজ ও সভ্যতা। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে মানুষ যতো আধুনিক হচ্ছে, ততোই হৃদয়ের দূরত্ব বাড়ছে। আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার প্রবণতা কমছে, সমাজে বাড়ছে একাকিত্ব ও মানসিক অস্থিরতা। এমন বাস্তবতায় ইসলাম মানুষের হৃদয়কে একসূত্রে গাঁথার জন্য যে অপূর্ব শিক্ষা দিয়েছে, তার অন্যতম হলো মানুষকে খাদ্য খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? তিনি বললেন—
تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
‘তুমি খাদ্য খাওয়াবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সুন্দর সমাজ গঠনের দুইটি মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরেছেন। একটি মানুষের দেহের প্রয়োজন পূরণ করে, অন্যটি হৃদয়ের প্রয়োজন পূরণ করে। খাদ্য মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে, আর সালাম মানুষের অন্তরে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে।
ইসলামে খাদ্য খাওয়ানো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন—
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য খাওয়ায়।’ (সুরা আল-ইনসান, আয়াত : ৮)
খাদ্য খাওয়ানো শুধু দান নয়; এটি মানুষের প্রতি মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার করানো তার জীবন ও মর্যাদা রক্ষার শামিল। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁরা জানতেন, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ।
আজকের সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োজন আরো বেশি। চারদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দরিদ্রতা ও খাদ্যসংকট অনেক মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। অথচ সামর্থ্যবানদের অনেকেই বিলাসিতায় অর্থ ব্যয় করলেও অভাবীদের কথা ভুলে যায়। ইসলাম আমাদের শেখায়, নিজের খাবারের টেবিলে অন্যের অধিকারও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ
‘সে প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেটভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১২)
শুরুতে উল্লেখিত হাদিসের দ্বিতীয় অংশে রাসুলুল্লাহ (সা.) সালামের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সালাম শুধু একটি সম্ভাষণ নয়; এটি দোয়া, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার ঘোষণা। ‘আসসালামু আলাইকুম’ অর্থ, ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ একজন মুসলিম যখন অন্য মুসলিমকে সালাম দেয়, তখন সে তার জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করে।
দুঃখজনকভাবে আজ অনেক মানুষ শুধু পরিচিত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সালাম দেয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে বলেছেন, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিতে। কারণ এটি অহংকার ভেঙে দেয়, সামাজিক দূরত্ব কমায় এবং হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় করে। একটি হাসিমাখা সালাম কখনো অপরিচিত মানুষকেও আপন করে নিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন—
أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রচলন ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৪)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর পরস্পরকে ভালোবাসা না পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৪)
এখানে বোঝা যায়, সালাম শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; এটি ঈমান ও জান্নাতের পথের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আমল।
বর্তমান যুগে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে যতো সংযুক্ত হচ্ছে, বাস্তবে ততো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। একই পরিবারে থেকেও অনেকে পরস্পরের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলে না। প্রতিবেশীরা একে অপরের খবর জানে না। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামের এই শিক্ষা সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া এবং মানুষকে হাসিমুখে সালাম দেওয়া সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতার পরিবেশ তৈরি করে।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি মানবিকতারও ধর্ম। একজন মুসলিমের ঈমান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার আচরণে অন্য মানুষ নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সহানুভূতি অনুভব করে। তাই আমাদের উচিত, নিজেদের জীবন ও সমাজে এই নববী শিক্ষার চর্চা বৃদ্ধি করা। হয়তো একটি খাবার, একটি সালাম কিংবা একটি আন্তরিক আচরণ কারো জীবনে আশা ও প্রশান্তির আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






