ব্রহ্মপুত্রের তীরে নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন মদিনা মসজিদ
- বাংলাদেশের প্রথম বৈদ্যুতিক গম্বুজ সম্বলিত মসজিদ

সংগৃহীত ছবি
মসজিদের গম্বুজ সরে যেতেই উন্মুক্ত হয়ে যায় আকাশ। বৈদ্যুতিক সুইচের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক পাশে সরে যায় বিশাল গম্বুজটি, আবার ফিরে আসে আগের অবস্থানে। স্থাপত্যের এই অভিনব কৌশল যেন ধর্মীয় আবহের সঙ্গে যুক্ত করেছে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়। তাই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সবুজে ঘেরা নিভৃত গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা মদিনা মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, অনন্য নির্মাণশৈলীর এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শনও।
ময়মনসিংহ জেলার চরসিরতা ইউনিয়নের চরখরিচা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি এরই মধ্যে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন মসজিদটির স্থাপত্যসৌন্দর্য দেখতে। পবিত্র মদিনা নগরীর মসজিদে নববির স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে এর নকশা তৈরি করা হয়েছে। সেই অনুকরণেই মসজিদটির নাম রাখা হয়েছে মদিনা মসজিদ।
২০১১ সালে শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। শুরু থেকেই মসজিদটিকে ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য মাঝখানের বিশাল বৈদ্যুতিক গম্বুজ। সুইচের মাধ্যমে গম্বুজটি সরিয়ে দিলে মসজিদের অভ্যন্তর থেকে সরাসরি দেখা যায় খোলা আকাশ। আবার প্রয়োজনমতো গম্বুজটি আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায়। প্রচলিত মসজিদ স্থাপত্যে এমন ব্যবস্থা বিরল। এ কারণেই মদিনা মসজিদকে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক গম্বুজের মসজিদ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হচ্ছে।
মসজিদের মূল কাঠামোর নান্দনিকতা আরও বাড়িয়েছে ছাদের গম্বুজগুলো। চার কোণে চারটি এবং সামনের অংশে আরও চারটি, সব মিলিয়ে রয়েছে একই আকৃতির আটটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ। দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কারুকার্যখচিত দুটি মিনার। চারতলা ভবনের ছাদ থেকে মিনার দুটির উচ্চতা ১৬০ ফুট। দূর থেকেই চোখে পড়ে এগুলোর সুউচ্চ অবয়ব। মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি আশপাশের পরিবেশে সৃষ্টি করে স্বতন্ত্র এক আবহ।
চারতলাবিশিষ্ট মসজিদটির ভেতরেও রয়েছে প্রশস্ত পরিসর। নিচতলায় নামাজের কাতার ১৭টি। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে ২০টি করে কাতার। প্রতিটি কাতারে ১১০ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। নিচতলার বাইরের বারান্দায় রয়েছে আরও তিনটি কাতার। ফলে মসজিদটিতে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জুমার দিনে এখানে মুসল্লিদের সমাগম বাড়ে। ভেতরের জায়গা পূর্ণ হয়ে গেলে বাইরের অংশেও নামাজ আদায় করেন অনেকে।
মসজিদের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে মার্বেল পাথর। প্রবেশপথের স্তম্ভগুলোতে রয়েছে মিরর টাইলসের ব্যবহার। বিশাল সেগুন কাঠের দরজায় সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং অভ্যন্তরে মানানসই ঝাড়বাতি পুরো স্থাপত্যে যোগ করেছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। স্বচ্ছ কাচের দেয়াল মসজিদের সৌন্দর্যকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য রাখা হয়েছে প্রশস্ত চারটি সিঁড়ি। প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য রয়েছে ছোট-বড় ছয়টি কাঠের দরজা।
মসজিদটির নির্মাণব্যয়ও এর বিশালতার পরিচয় বহন করে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন গুলশান আজাদ মসজিদের খতিব ও বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান।
ময়মনসিংহ শহর থেকে শম্ভুগঞ্জ-পরাণগঞ্জ সড়ক ধরে সহজেই পৌঁছানো যায় মদিনা মসজিদে। চাইলে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়েও আসা যায়। শহরের কোলাহল পেরিয়ে নদীতীরের সবুজ পরিবেশে মসজিদটির অবস্থান দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
ধর্মীয় স্থাপত্যের সৌন্দর্য, আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্মিলনে মদিনা মসজিদ হয়ে উঠছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থাপনাগুলোর একটি। তবে এর মূল পরিচয় ইবাদতকেন্দ্র হিসেবেই। নান্দনিক অবয়বের পাশাপাশি মুসল্লিদের জন্য প্রশস্ত পরিসর তৈরি করাই এই নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি স্থাপত্যের বিস্ময়ের পাশাপাশি ধর্মীয় আবহ ও সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল।




