যে সময়ে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন আকাশের দরজাগুলো যেন রহমতের জন্য আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে যায়। সে সময় বান্দার একটি আন্তরিক কান্না, একটি নিঃশব্দ মিনতি কিংবা একটি ছোট্ট দোয়াও আল্লাহর দরবারে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। এমনই এক মহামূল্যবান সময় হলো আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়। হাদিসের ভাষ্যমতে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " الدُّعَاءُ لاَ يُرَدُّ بَيْنَ الأَذَانِ وَالإِقَامَةِ ".
আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১২; আবু দাউদ, হাদিস : ৫২১)
এই হাদিসের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন মুমিনের জন্য বিশাল সুসংবাদ। মহান আল্লাহ এমন কিছু সময় নির্ধারণ করেছেন, যখন বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় তেমনই একটি বরকতময় মুহূর্ত। এ সময় মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে আল্লাহর ঘরের দিকে, আল্লাহর ইবাদতের দিকে এগিয়ে যায়। হৃদয় তখন অপেক্ষা করে নামাজের জন্য, আর সেই অপেক্ষার সময়টিই দোয়ায় ভরে তোলার শিক্ষা দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অনেকেই আজান শুনে শুধু নামাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকি। কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকি, কেউ গল্পে, কেউ আবার অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় কাটিয়ে দিই। অথচ কয়েক মিনিটের এই সময়টুকু হতে পারে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ। হয়তো এই সময়ের একটি আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা দূর করে দিতে পারেন, অসুস্থকে সুস্থতা দান করতে পারেন, ঋণগ্রস্তকে মুক্তি দিতে পারেন, সন্তানের জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করতে পারেন কিংবা গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন।
ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, এই হাদিস প্রমাণ করে যে আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় অধিক পরিমাণে দোয়া করা মুস্তাহাব। (আল-মাজমু, ৩/১১৯) ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-ও এই সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারি)
তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া কবুল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক দোয়া ঠিক আমাদের চাওয়া অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হবে। আল্লাহ তাআলা তার অসীম প্রজ্ঞা অনুযায়ী বান্দার জন্য যা উত্তম, তাই নির্ধারণ করেন। কখনো দুনিয়াতেই দোয়া কবুল করেন, কখনো তার বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করে দেন, আবার কখনো আখিরাতের জন্য তার প্রতিদান সঞ্চিত রাখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে এমন দোয়া করে না, যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, কিন্তু আল্লাহ তাকে এর তিনটির একটি অবশ্যই দান করেন। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১১১৩৩)
তাই আজান ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হৃদয়ও যেন জেগে ওঠে। আজানের উত্তর দেওয়ার পর ইকামত পর্যন্ত সময়টুকু নীরবে, বিনয়ের সঙ্গে এবং গভীর একাগ্রতায় আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করি। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশ, মুসলিম উম্মাহ এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ কামনা করি।
হয়তো কোনো এক আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যাবে। তাই এই মহামূল্যবান মুহূর্তকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




