পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের জন্য সন্তানের করণীয় আমলসমূহ

প্রতীকী ছবি
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় তাদের সেবা করা যেমন সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব, তেমনি তাদের মৃত্যুর পরও দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ইসলাম শিক্ষা দেয়, মৃত্যুর পরও সন্তান এমন কিছু আমল করতে পারে, যার সওয়াব পিতা-মাতার কাছে পৌঁছে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
সুতরাং নেককার সন্তানের উচিত পিতা-মাতার মৃত্যুর পর নিয়মিত এমন কিছু আমল অব্যাহত রাখা যেগুলোর দ্বারা নিজেদের পিতা-মাতার কাছে সওয়াব পৌঁছে এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। এ ক্ষেত্রে ইসলাম আমাদের যে আমলগুলোর কথা নির্দেশনা প্রদান করে তন্মধ্যে রয়েছে-
এক. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা:
এটি মৃত পিতা-মাতার জন্য সবচেয়ে সহজ এবং সর্বোত্তম আমল। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দোয়া শিখিয়েছেন,
رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا
উচ্চারণ: রব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগীরা।
অর্থ: হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সুরা ইসরা, আয়াত : ২৪)।
رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ
উচ্চারণ : রব্বানাগফির লী ওয়ালিওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুমিনীনা ইয়াওমা ইয়াকূমুল হিসাব।
‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪১]
এক হাদিসে এসেছে, সন্তানের ইস্তিগফারের কারণে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। (আল-আদাবুল মুফরাদ)
দুই. তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা:
বিশেষ করে সাদাকায়ে জারিয়া, যেমন নলকূপ স্থাপন, মসজিদ বা মাদরাসায় সহযোগিতা, কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমে দান কিংবা জনকল্যাণমূলক স্থায়ী কাজ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সন্তানের পক্ষ থেকে করা সদকার সওয়াব মৃত পিতা-মাতার কাছে পৌঁছে। (মুসলিম, হাদিস: ১০০৪)
তিন, তাদের অসমাপ্ত শরয়ি দায়িত্ব পূরণ করা:
যদি মানতের রোজা, হজ, বৈধ ওসিয়ত বা মান্নত অপূর্ণ থাকে, তাহলে সন্তান তা আদায় করতে পারে। এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিসে অনুমোদন এসেছে। (বুখারি, হাদিস: ১৮৫২, ১৯৫২)
চার. পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধ করা:
ইসলামে ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪১৩)। তাই তাদের কোনো ঋণ থাকলে দ্রুত তা পরিশোধের চেষ্টা করা উচিত।
পাঁচ. তাদের বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা এবং মানুষের হক আদায় করা:
যদি কারও কাছে কোনো আমানত, পাওনা বা অন্যের অধিকার থেকে থাকে, যথাসম্ভব তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করা সন্তানের দায়িত্বের অংশ।
ছয়. পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা:
‘ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত যে, যখন তিনি মক্কাহ অভিমুখে রওনা হতেন তখন তার সাথে একটি গাধা থাকত। উটের সওয়ারীতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ক্ষণিক স্বস্তি লাভের জন্য তাতে আরোহণ করতেন। আর তার সঙ্গে একটি পাগড়ী থাকত, যা দিয়ে তিনি মাথা বেঁধে নিতেন। কোনো এক সময় তিনি উক্ত গাধায় আরোহণ করে যাচ্ছিলেন, তখন তার পাশ দিয়ে একজন বেদুঈন অতিক্রম করছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি অমুকের পুত্র অমুক নও? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তাকে গাধাটি দিয়ে দিলেন এবং বললেন, এতে আরোহণ কর। তিনি তাকে পাগড়ীটিও দান করলেন এবং বললেন, এটি দ্বারা তোমার মাথা বেঁধে নাও। তখন তার সঙ্গীদের কেউ কেউ তাকে বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি এ বেদুঈনকে গাধাটি দিয়ে দিলেন, যার উপর আরোহণ করে আপনি স্বস্তি লাভ করতেন এবং পাগড়ীটিও দান করলেন, যার দ্বারা আপনার মাথা বাঁধতেন। তখন তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো কোনো ব্যক্তির পিতার ইন্তিকালের পর তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখা। আর এ বেদুঈনের পিতা ছিলেন উমর (রা.) এর অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৫২)।
এই হাদিস মৃত পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম সুন্দর একটি শিক্ষা আমাদের সামতে তুলে ধরে।
সাত. তাদের রেখে যাওয়া ভালো কাজগুলো চালু রাখা:
কোনো মসজিদ, মক্তব, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা কল্যাণমূলক উদ্যোগে তারা যুক্ত থাকলে তা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করা । এতে তাদের সওয়াবের ধারা চলমান থাকে।
আট. কবর জিয়ারত করে দোয়া করা:
কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া নয়; বরং তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা এবং নিজের আখিরাতের কথা স্মরণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১০৫৪)
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সব আমলই কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিন, চল্লিশা, বার্ষিকী বা শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন কোনো রীতিকে ইবাদত মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
পিতা-মাতার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা শুধু জীবদ্দশায় সেবায় নয়, তাদের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে দোয়া, সদকা, মানুষের হক আদায়, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং তাদের রেখে যাওয়া সৎকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাধ্যমে। নেক সন্তানের এসব আমলই পিতা-মাতার জন্য পরকালে অবিরাম উপকারের কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এ আমলগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেমও সাংবাদিক
saifpas352@g,ail.com




