যে সবর মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বানায়
- সবর যেভাবে মানুষকে বদলে দেয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবন কখনোই একরৈখিক নয়। সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা, আনন্দ-বেদনা, সফলতা-ব্যর্থতা সব মিলিয়েই মানুষের জীবন। কখনো রোগ, কখনো দারিদ্র্য, কখনো প্রিয়জন হারানোর শোক, কখনো মানুষের অবহেলা কিংবা জীবনের অনিশ্চয়তা মানুষর প্রত্যহিক জীবনের পথ চলা থমকে যেতে চায়। এমন কঠিন সময়েই ইসলামের এক মহামূল্যবান শিক্ষা মানুষকে মনোবল ফিরে পেতে ও সামনে এগিয়ে যেতে আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দেয়। সেটি হচ্ছে ‘সবর’।
সবর শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয়। বিপদে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা, গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং আল্লাহর আদেশের ওপর অবিচল থাকার নাম সবর। তাই সবর একজন মুমিনের আত্মিক শক্তি, ঈমানের সৌন্দর্য এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)
একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে যে, আল্লাহ নিজেই তার সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিচ্ছেন! কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তব জীবনে একজন মানুষ কীভাবে সবর করবে?
প্রথমত, মনে রাখতে হবে দুনিয়া পরীক্ষার স্থান। অনেক মানুষ বিপদ এলেই ভাবতে শুরু করে, ‘কেন আমার সঙ্গেই এমন হলো?’ অথচ পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে বলে রেখেছে,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদহানি, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৫৫)
আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিপদ আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটিই জীবনের অংশ। আর এ উপলব্ধি মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত করে। যে বুঝতে পারে দুনিয়া চিরস্থায়ী সুখের জায়গা নয়, তখন বিপদে কম ভেঙে পড়ে না।
দ্বিতীয়ত, সবরের সবচেয়ে বড় উপায় হলো সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ
‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ৪৫)
মানুষ যখন দুঃখে পড়ে, তখন সাধারণত মানুষের কাছেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করে। অথচ প্রকৃত প্রশান্তি আসে আল্লাহর কাছে হৃদয় খুলে বলার মাধ্যমে। তাহাজ্জুদের নির্জনতায়, সিজদার অশ্রুতে। আর দোয়ায় মানুষ এমন এক শক্তি লাভ করে, যা মানুষের দেয়া কোনো সান্ত্বনা কিছুতেই দিতে পারে না।
তৃতীয়ত, মুখের অভিযোগ কমিয়ে অন্তরের তাওয়াক্কুল বাড়াতে হবে। সবর মানে এই নয় যে, মানুষের কষ্ট হবে না বা চোখে অশ্রু আসবে না। ইয়াকুব (আ.) নিজের সন্তান ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদে কেঁদেছেন। নবিজি (সা.)-ও সন্তান ইবরাহিমের মৃত্যুতে অশ্রু ঝরিয়েছেন। কিন্তু তারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত ধৈর্য হলো আঘাতের প্রথম মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করা।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৮৩)
অর্থাৎ বিপদ আসার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, হতাশ না হওয়া এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টাই প্রকৃত সবর।
চতুর্থত, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও সবরের অংশ। অনেক সময় মানুষ দুঃখে পড়ে হারাম পথে সমাধান খোঁজে। কেউ সুদের দিকে যায়, কেউ প্রতিশোধে নেশায় অন্যায় করে, কেউ হতাশ হয়ে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। অথচ প্রকৃত সবর হলো, কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর সীমারেখা অতিক্রম না করা। ইউসুফ (আ.) যুবক বয়সে ভয়ংকর পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েও গুনাহ থেকে বেঁচেছিলেন। এ কারণেই আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন।
পঞ্চমত, সবরের প্রতিদান স্মরণ করা জরুরি। দুনিয়ায় অনেক কষ্টের প্রতিদান মানুষ পায় না। কিন্তু আল্লাহ সবরের প্রতিদান সীমাহীন রেখেছেন।
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে হিসাব ছাড়া।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ১০)
হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘সবর এমন এক সম্পদ, যার শেষ ফল কখনো তিক্ত হয় না।’ বাস্তবেও দেখা যায়, যে মানুষ ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, একসময় আল্লাহ তার জন্য এমন পথ খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করেনি।
আজকের যুগে মানুষের অস্থিরতা অনেক বেড়ে গেছে। সামান্য ব্যর্থতায় হতাশা, সামান্য সমালোচনায় ভেঙে পড়া, সামান্য কষ্টে অভিযোগ করা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মুমিনের শক্তি এখানেই যে, সে ঝড়ের মধ্যেও ঈমান হারায় না। পৃথিবী তাকে কাঁদাতে পারে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি আস্থা থেকে সরাতে পারে না।
সবর মানে দুর্বলতা নয়; বরং এটি আত্মার শক্তি। সবর মানে নীরবে কষ্ট সহ্য করা নয়; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে গিয়ে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা। যে মানুষ সবর করতে শেখে, সে জীবনের কঠিন সময়েও ভেঙে পড়ে না। কারণ সে জানে, প্রতিটি রাতের পরই সকাল আসে এবং প্রতিটি কষ্টের পরই আল্লাহ সহজি দান করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)
তাই আসুন, আমরা জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে সবরের পথ বেছে নিই। বিপদ এলেই হতাশা, অভিযোগ ও অস্থিরতায় ডুবে না গিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। নিজের হৃদয়কে সালাত, দোয়া ও কোরআনের আলো দিয়ে শক্ত করি। মনে রাখি, দুনিয়ার প্রতিটি কষ্ট সাময়িক, কিন্তু সবরের প্রতিদান চিরস্থায়ী।
আজ পরিবারে, সমাজে এবং ব্যক্তিজীবনে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, সহনশীলতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা। রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা, বিপদের সময় আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
আসুন, আমরা এমন সবর অর্জনের চেষ্টা করি, যে সবর মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিপদে ধৈর্যধারণ, নিয়ামতের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং প্রতিটি অবস্থায় তাঁর ওপর ভরসা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




