ধৈর্যের চেয়ে উত্তম কোনো উপহার নেই

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবন চলার পথে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে গুণটি, তা হলো সবর বা ধৈর্য। সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ, সম্পর্কের টানাপড়েন- সবকিছুর মাঝেই নিজেকে স্থির রাখতে সহায়তা করে সবর। ব্যক্তির জীবনে সবর ইমানের শক্ত ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
‘সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো দান কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪৬৯)
এই হাদিসটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে পরিবর্তন করে দেয়। সাধারণত মানুষ বেশি পরিমাণ সম্পদ, ক্ষমতা বা সুযোগকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রকৃত ও সর্বোত্তম প্রাপ্তি হলো সবর।
শুধু কষ্টের সময় চুপ থাকাই নয়; সবরের মধ্যে আরও তিনটি দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমত, বিপদে অস্থির না হয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা। দ্বিতীয়ত, গুনাহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা। তৃতীয়ত, ইবাদত ও দায়িত্ব পালনে স্থির থাকা।
ইবনুল কাইয়্যিম জাওযিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, সবর হলো আত্মাকে আল্লাহর নির্দেশের ওপর দৃঢ়ভাবে আটকে রাখা এবং প্রবৃত্তির টান থেকে রক্ষা করা। (মাদারিজুস সালিকিন)
পবিত্র কোরআনুল কারিমেও সবরের গুরুত্ব বারবার এসেছে। মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
এটি এমন এক ঘোষণা, যার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। কারণ যার সঙ্গে আল্লাহ থাকেন, তার জীবনে আর কী প্রয়োজন।
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে—
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
‘ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫) অর্থাৎ সবর শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়, বরং এটি জান্নাতের সুসংবাদ লাভের মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সবরের বাস্তব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তায়েফের ঘটনার সময় যখন তিনি পাথরের আঘাতে আহত হন, তখনো তিনি আল্লাহর কাছে হিদায়াতের দোয়া করেন, প্রতিশোধ চাননি। উহুদের যুদ্ধে সাহাবিদের কষ্টকর পরিস্থিতিতেও তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার শিক্ষা দিয়েছেন।
সবরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে সম্পর্ক, পরিবার, অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যক্তিগত কষ্টের সময়। এমন মুহূর্তে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায়। কিন্তু ইসলাম শেখায়, সেই সময়েই মুমিনের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ইমানের অর্ধেক হলো সবর। কারণ জীবনের অধিকাংশ নেক আমলই ধৈর্যের সঙ্গে যুক্ত।
সবরের প্রতিদান শুধু আখিরাতে সীমাবদ্ধ নয়। দুনিয়াতেও এটি মানুষকে মানসিক শান্তি, স্থিরতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি দেয়। অস্থির মানুষ দ্রুত ভেঙে পড়ে, আর ধৈর্যশীল মানুষ ধীরে হলেও সফলতার পথে এগিয়ে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সবর মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য এনে দেয়। কারণ আল্লাহতাআলা নিজেই ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি এমন এক মর্যাদা, যা কোনো সম্পদ বা ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা যায় না।
সুতরাং সবর কোনো নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং এটি একধরনের শক্তি, যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, শুদ্ধ করে এবং আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেয়। আর তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্যই বলেছেন, সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো দান কাউকে দেওয়া হয়নি।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




