শিশুর প্রতি স্নেহ প্রকাশে ইসলামের শিক্ষা কী

প্রতীকী ছবি
শিশুরা ফুলের মতো কোমল। তাদের হাসি, সরলতা ও নিষ্পাপ আচরণ মানুষের হৃদয়ে মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং মানসিক প্রশান্তি। বিশেষত মা-বাবা, পরিবারের সদস্য ও শিক্ষকদের স্নেহ শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শিশুকে আদর করার নামে কী করা যাবে, কী করা যাবে না, কোথায় স্নেহের সীমা এবং কীভাবে শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশের ধরন নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের নির্দেশনা নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন।
ইসলাম শিশুর প্রতি দয়া, মমতা ও ভালোবাসাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের স্নেহ করতেন, তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের প্রতি মমতা প্রকাশ করতেন। আনাস ইবন মালিক (রা.) দীর্ঘদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবা করেছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো তাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য এভাবে তিরস্কার করেননিে, ‘এটা কেন করলে?’ কিংবা ‘এটা কেন করলে না?’ (বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮) এই আচরণ শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কোমল ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
শিশুদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও স্পষ্ট। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নাতি হাসান ইবন আলী (রা.)-কে চুমু দিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত আকরা ইবন হাবিস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেলন, তার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি কাউকেই চুমু দেননি। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)
এখান থেকে বোঝা যায় যে, শিশুকে আদর করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি নবীজী (সা.)-এর শেখানো মানবিক আচরণের অংশ। শিশুর সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনমতো কোলে নেওয়া এবং উপযুক্তভাবে স্নেহ প্রকাশ করা শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
তবে ইসলাম যেমন স্নেহের শিক্ষা দেয়, তেমনি মানুষের সম্মান, শালীনতা ও অধিকার রক্ষার নির্দেশনাও দেয়। অতএব, শিশুকে আদর করার বিষয়টি শুধু আদরকারীর উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। আদরের ধরন, পরিস্থিতি, শিশুর স্বস্তি এবং আচরণটির সামাজিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
শিশুকে কোলে নেওয়া, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া কিংবা কপালে চুমু দেওয়ার মতো স্নেহপূর্ণ আচরণ অনেক পরিবার ও সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক। তবে সব ধরনের স্পর্শ সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে উপযুক্ত নয়। শিশুর বয়স, সম্পর্কের ধরন, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং পরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে পেশাগত শালীনতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো শিশুকে এমনভাবে স্পর্শ করা উচিত নয়, যাতে সে অস্বস্তি, ভয়, লজ্জা বা অনিরাপত্তা অনুভব করে। শিশুর শরীরের ব্যক্তিগত অংশে স্পর্শ, জোর করে চুমু দেওয়া কিংবা শিশুর আপত্তি উপেক্ষা করে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা স্নেহের গ্রহণযোগ্য প্রকাশ নয়। সে কোনো আদর প্রত্যাখ্যান করলে তাকে ধমক দেওয়া, লজ্জা দেওয়া কিংবা জোর করা উচিত নয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, শিশু অনেক সময় নিজের অস্বস্তি স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তাই বড়দের দায়িত্ব হলো তার আচরণ, মুখের অভিব্যক্তি ও প্রতিক্রিয়া বুঝতে চেষ্টা করা। শিশুর নীরবতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মতি মনে করা যাবে না।
একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও মানসিক বিকাশেও ভূমিকা রাখেন। একজন ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ভালোবাসবেন, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এবং ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেবেন। তবে শিক্ষকের স্নেহ হতে হবে দায়িত্বশীল, সংযত ও পেশাগত সীমারেখার মধ্যে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে উৎসাহ দেওয়া, প্রশংসা করা, তার কৃতিত্বে আনন্দ প্রকাশ করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনমতো সান্ত্বনা দেওয়া স্নেহ প্রকাশের সুন্দর উপায়। এসবের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক ঘনিষ্ঠতা জরুরি নয়। শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় তার চোখের উচ্চতায় নেমে আসা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, ভুলের জন্য অপমান না করা এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গভীর মমতার প্রকাশ।
অভিভাবকদেরও উচিত শিশুদের ছোটবেলা থেকেই তার শরীর ও ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে বয়সোপযোগী ধারণা দেওয়া। তাকে শেখাতে হবে, তার শরীরের কিছু অংশ ব্যক্তিগত এবং সেগুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় পরিচর্যার মতো পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল বড়দের সাহায্য লাগতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রেও শিশুর মর্যাদা, প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।
শিশুকে এটাও শেখানো দরকার, কেউ কোনো আচরণে অস্বস্তি সৃষ্টি করলে সে ‘না’ বলতে পারে এবং বিশ্বস্ত অভিভাবক বা শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানাতে পারে। কেউ ভয় দেখালে, গোপন রাখতে বললে কিংবা তার অস্বস্তিকে তুচ্ছ করলে সে যেন নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে পারে। এসব শিক্ষা শিশুকে অবাধ্য করে না; বরং আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা তৈরি করে।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকা প্রয়োজন। অভিভাবকের উচিত সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন এমনভাবে কথা বলা, যাতে সে নির্ভয়ে স্কুলের আনন্দ, ভয়, অস্বস্তি কিংবা কোনো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। সন্তান কোনো অভিযোগ করলে প্রথমেই তাকে দোষারোপ করা বা তার কথা উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুদের সঙ্গে আচরণের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। শিক্ষক ও কর্মীদের জন্য নিরাপদ স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমারেখা, অভিযোগ গ্রহণ এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। কোনো অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।
মোট কথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য জরুরি। কোনো শিক্ষকের স্বাভাবিক ও শালীন স্নেহ প্রকাশকে প্রমাণ ছাড়া অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি স্নেহের অজুহাতে শিশুর ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘনের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখাও অনূচিত। ন্যায়বিচারের দাবি হলো, শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
মনে রাখতে হবে শিশুরা আমাদের কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাদের ভালোবাসা দিতে হবে, আবার সেই ভালোবাসার মধ্যেই তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। যে স্নেহ শিশুকে সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও নিরাপদ বোধ করায়, সেটিই প্রকৃত স্নেহ। আর যে আচরণ শিশুর মনে ভয়, অস্বস্তি কিংবা অনিরাপত্তা সৃষ্টি করে, তা থেকে বিরত থাকাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই, ভালোবাসা ও শালীনতা, মমতা ও দায়িত্ববোধ, স্নেহ ও নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



