তাওয়াফের সঠিক পদ্ধতি ও সাধারণ ভুলগুলো

সংগৃহীত ছবি
হজ ও ওমরার অন্যতম প্রধান ইবাদত হলো তাওয়াফ। পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের কেন্দ্র কাবাঘরকে ঘিরে আল্লাহর ইবাদতের এক অনন্য প্রকাশ এই তাওয়াফ। এটি শুধু শারীরিকভাবে সাত চক্কর দেওয়ার নাম নয়; বরং এটি ভালোবাসা, আনুগত্য ও আল্লাহকেন্দ্রিক জীবনের প্রতীক। তাই তাওয়াফ সঠিকভাবে আদায় করা যেমন জরুরি, তেমনি এ আমলের সময় প্রচলিত ভুলগুলো থেকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ
‘তারা যেন প্রাচীন এই ঘর (কাবা) তাওয়াফ করে।’ (সুরা হজ : ২৯)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন— ‘এই আয়াত তাওয়াফের শরয়ি বৈধতা ও গুরুত্বের অন্যতম মূল দলিল।’ (আল-জামি লি আহকামিল কোরআন, ১২/৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে তাওয়াফ করে উম্মতকে শিখিয়েছেন এবং বলেছেন—
»خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ«
‘তোমরা তোমাদের হজের বিধান আমার কাছ থেকে শিখে নাও।’ (মুসলিম, হাদিস : ১২৯৭)
তাওয়াফের সঠিক পদ্ধতি
তাওয়াফ শুরু হয় হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে। তাওয়াফকারী কাবাকে বাম পাশে রেখে সাত চক্কর সম্পন্ন করবেন।
তাওয়াফের আগে ওজু করা সুন্নাহ নয়, বরং অধিকাংশ ফকিহের মতে ওয়াজিব বা শর্তসদৃশ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) ওজু অবস্থায় তাওয়াফ করেছেন।
হাদিসে এসেছে— ‘নবী (সা.) প্রথমে ওজু করেন, এরপর তাওয়াফ করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৬১৪)
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন— ‘তাওয়াফ নামাজের সদৃশ। তাই এতে পবিত্রতা গুরুত্বপূর্ণ।’ (আল-মাজমু ৮/২০)
তাওয়াফ শুরু করার সময় সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে ইশারা বা চুম্বন করা সুন্নাহ।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে তাকবির বলতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৬১৩)
পুরুষদের জন্য তাওয়াফে দুটি বিশেষ সুন্নাহ রয়েছে, বিশেষত তাওয়াফে কুদুমে—
১. ইজতিবা:
ডান কাঁধ খোলা রাখা।
২.
রমল:
প্রথম তিন চক্করে কিছুটা দ্রুত ও দৃঢ়
ভঙ্গিতে হাঁটা।
জাবির (রা.) বর্ণনা করেছেন— ‘নবী (সা.) প্রথম তিন চক্করে দ্রুত হেঁটেছিলেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১২৬১)
তাওয়াফের সময় নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক দোয়া নেই। কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া বা তাসবিহ পড়া যায়। তবে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে এ দোয়াটি পড়া সুন্নাহ—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০১)
সাত চক্কর শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে সুযোগ থাকলে দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নাহ।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى
‘তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান বানাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)
তাওয়াফে প্রচলিত কিছু ভুল
বর্তমানে তাওয়াফের সময় অনেক ভুল ও বাড়াবাড়ি দেখা যায়, যা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে।
সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো অন্য মুসল্লিকে কষ্ট দেওয়া। অনেকেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার বা মারামারির মতো আচরণ করেন। অথচ ইসলামে অন্য মুসলিমকে কষ্ট দেওয়া হারাম।
ওমর (রা.) হাজরে আসওয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন— ‘আমি জানি তুমি একটি পাথর, উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা তোমার নেই। আমি যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তবে কখনো চুম্বন করতাম না।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫৯৭)
এ হাদিস প্রমাণ করে, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা সুন্নাহ; কিন্তু মানুষের কষ্টের বিনিময়ে নয়।
আরেকটি ভুল হলো, প্রতিটি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক মনে করা। অনেকেই বই দেখে উচ্চস্বরে দলবদ্ধভাবে দোয়া পড়েন, যা অন্যদের মনোযোগ নষ্ট করে। অথচ সহিহ হাদিসে প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট দোয়ার প্রমাণ নেই।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন— ‘তাওয়াফের প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া নির্ধারণ করা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়।’ (মাজমু ফাতাওয়া, ২৬/১২২)
আরেকটি ভুল হলো তাওয়াফকে ছবি ও ভিডিওর অনুষ্ঠানে পরিণত করা। কেউ তাওয়াফের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছেন, কেউ লাইভ ভিডিও করছেন। এতে নিজের খুশু-খুজু যেমন নষ্ট হয়, অন্যদেরও কষ্ট হয়।
ইমাম গাজালি (রহ.) লিখেছেন— ‘তাওয়াফের সময় হৃদয় আল্লাহর স্মরণে ঘুরবে, শুধু শরীর নয়।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৫০)
কিছু মানুষ তাওয়াফের সময় কাবার দেয়াল বা গিলাফকে এমনভাবে স্পর্শ করেন যেন সেখান থেকেই বরকত আসে। অথচ বরকত আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। কাবাকে সম্মান করা ইবাদত, কিন্তু অতিরঞ্জন করা শরিয়তসম্মত নয়।
তাওয়াফের সময় উচ্চস্বরে ঝগড়া, মোবাইলে কথা বলা, অন্যকে ঠেলে সামনে যাওয়া কিংবা নামাজরত মানুষের সামনে দিয়ে চলাও ভুল আচরণের অন্তর্ভুক্ত।
তাওয়াফ মূলত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের ইবাদত। তাই এখানে বাহ্যিক ভিড়ের মধ্যেও অন্তরকে শান্ত, বিনয়ী ও আল্লাহমুখী রাখতে হবে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন— ‘তাওয়াফের প্রকৃত রহস্য হলো, মানুষের হৃদয় যেন কাবার চারপাশে নয়, কাবার রবের চারপাশে আবর্তিত হয়।’ (জাদুল মাআদ, ২/২৮৭)
মহান আল্লাহ আমাদের তাওয়াফকে সহিহ, সুন্দর ও কবুল করুন এবং এই ইবাদতের অন্তর্নিহিত আত্মিক শিক্ষা উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।






