আরাফার রোজা কোন দিন: মতভেদ ও করণীয়

সংগৃহীত ছবি
আরাফার দিনের রোজা রোজা ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ নফল আমল। হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
তবে প্রতি বছর এই সময়ে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, আরাফার রোজা আসলে কোন দিন রাখা হবে? নিজ দেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ৯ জিলহজে, নাকি সৌদি আরবে হাজিদের আরাফায় অবস্থানের দিন অনুযায়ী?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদি মত রয়েছে। উভয় পক্ষেরই দলিল ও গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা আছে। তাই এ নিয়ে বিভেদ, বিদ্বেষ বা তর্ক-বিতর্কে জড়ানো মোটেও কাম্য নয়।
প্রথম মতটি হলো, প্রত্যেক দেশ নিজ নিজ চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ৯ জিলহজ নির্ধারণ করবে এবং সে অনুযায়ী আরাফার রোজা পালন করবে। এটি ফুকাহা ও জুমহুর আলেমদের মত। তারা বলেন, যেভাবে রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও অন্যান্য আমল স্থানীয় চাঁদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তেমনি আরাফার রোজাও নিজ দেশের তারিখ অনুযায়ী হবে।
এই মতের আলোকে বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য ২০২৬ সালে ২৭ মে বুধবার আরাফার রোজার দিন হবে।
অন্যদিকে আধুনিক যুগের কিছু নির্ভরযোগ্য আলেমের অভিমত হলো, ‘আরাফা’ একটি নির্দিষ্ট স্থান ও দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেদিন হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন, সেদিনই বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আরাফার রোজা রাখা অধিক সমীচীন। তাদের মতে, হজের মূল আমলের সঙ্গে এ রোজার সম্পর্ক রয়েছে।
এই মত অনুযায়ী ২০২৬ সালের আরাফার রোজা হয় ২৬ মে মঙ্গলবার।
বাস্তবতা হলো, এটি আকিদাগত বা মৌলিক কোনো বিরোধ নয়; বরং ইজতিহাদি মতপার্থক্য। ইসলামের ইতিহাসে এ ধরনের ফিকহি মতভেদ বহু বিষয়ে ছিল এবং থাকবে। তাই কেউ যদি নিজ দেশের চাঁদের হিসেবে রোজা রাখেন কিংবা সৌদির হিসাব অনুযায়ী রাখেন, উভয় ক্ষেত্রেই তিনি গ্রহণযোগ্য আলেমদের মত অনুসরণ করছেন বলেই ধরে নিতে হবে।
তবে যারা দ্বিধায় থাকেন বা ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করেন, তাদের জন্য একটি সহজ পথ রয়েছে। তারা চাইলে ২৬ ও ২৭ মে উভয় দিনই সাধারণ নফল রোজার নিয়তে রোজা রাখতে পারেন। এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, দুটি দিনকে আলাদাভাবে ‘দুইটি আরাফার রোজা’ মনে করা ঠিক নয়। কারণ শরিয়তে আরাফার দিন একটিই।
তাই জিলহজের নফল রোজার নিয়ত করতে হবে। আর যেহেতু দুই দিনের একদিন অবশ্যই আরাফার দিন হবে, তাই ইনশাআল্লাহ আরাফার রোজার মূল সওয়াবও অর্জিত হয়ে যাবে।
বিষয়টি অনেকটা লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধানের মতো। কদরের রাত নির্দিষ্টভাবে জানা না থাকায় মানুষ শেষ দশকের একাধিক রাতে ইবাদত করে। ফলে নিশ্চিতভাবেই সে কদরের ফজিলত লাভ করে। এখানেও একই ধরনের প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
তবে কেউ যদি নির্দিষ্টভাবে ‘আরাফার রোজা’র নিয়ত করতে চান, তাহলে একদিনই করবেন। সেটি হবে হয় নিজ দেশের ৯ জিলহজ অনুযায়ী, অথবা সৌদি আরবের আরাফার দিনের হিসেবে। যেটিকে তার কাছে অধিক শক্তিশালী ও দলিলসম্মত মনে হয়।
অনেক গবেষক আলেম শেষ পর্যন্ত জুমহুর ফকিহদের মতকেই অধিক শক্তিশালী বলেছেন। কারণ ইসলামের অধিকাংশ সময়ভিত্তিক ইবাদত স্থানীয় চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। তবে বিপরীত মতটিও সম্মানযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদের অন্তর্ভুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের মাসআলাকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি, কটূক্তি বা সামাজিক বিরোধ সৃষ্টি না হওয়া। কারণ ইবাদতের সৌন্দর্য শুধু আমলে নয়, আদব ও ভ্রাতৃত্ববোধেও প্রকাশ পায়।
মহান আল্লাহ আমাদের আমলগুলো কবুল করুন, সঠিক বুঝ দান করুন এবং মতভেদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






