হাদিসের বাণী
অন্যের গুনাহ নিয়ে উপহাসের ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
অন্য কারও ভুল ধরা, তার দুর্বলতা কিংবা গুনাহকে উপহাস করা আজ অনেকের কাছে বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তব জীবন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সর্বত্র কারও অতীতের ভুল কিংবা বর্তমানের গুনাহ নিয়ে বিদ্রূপ, ব্যঙ্গ কিংবা লজ্জা দেওয়া খুব স্বাভাবিক ও মুখ রোচক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। অথচ ইসলাম এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে যেমন নিরুৎসাহিত করেছে তেমনি এর ভয়াবহ পরিণতির কথাও সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ عَيَّرَ أَخَاهُ بِذَنْبٍ لَمْ يَمُتْ حَتَّى يَعْمَلَهُ
‘কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাইকে কোনো গুনাহর জন্য লজ্জা দিলে সে উক্ত গুনাহে না জড়িয়ে পড়া পর্যন্ত মারা যাবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০৫)
হাদিসটির অর্থ এই নয় যে এটি অবধারিত ভাগ্যের ঘোষণা। বরং এটি একটি কঠোর সতর্কবাণী। যে ব্যক্তি অন্যের গুনাহ নিয়ে অহংকার করে, নিজেকে নিরাপদ মনে করে এবং অপরকে হেয় করে, আল্লাহ চাইলে তাকেও একই ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। কারণ মানুষ নিজের শক্তিতে নয়, আল্লাহর রহমতেই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। কে প্রকৃত মুত্তাকি, তিনিই তা ভালো জানেন।’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত : ৩২)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, অন্যের দোষ দেখে নিজেকে ধার্মিক মনে করার কোনো সুযোগ নেই। একজন মানুষ আজ নেককার, কিন্তু কাল সে পরীক্ষায় পড়তে পারে। আবার যে ব্যক্তি আজ গুনাহে নিমজ্জিত, সে হয়তো আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারে। মানুষের অন্তরের খবর কেবল আল্লাহই জানেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, গুনাহের কারণে কান্নাকারী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সেই অহংকারী ইবাদতকারীর চেয়েও প্রিয় হতে পারে, যে নিজের আমল নিয়ে গর্ব করে। কারণ তাওবা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, আর অহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যের গুনাহ নিয়ে উপহাস করার আরেকটি বড় ক্ষতি হলো, এতে সংশোধনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। যে মানুষ অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসতে চায়, তাকে যদি সমাজ অপমান করে, তবে সে আরও হতাশ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের দোষ গোপন রাখা এবং তার জন্য হেদায়েতের দোয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৯০)
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ভুলের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া, পুরোনো পাপ খুঁজে এনে বিদ্রূপ করা কিংবা কাউকে চিরদিনের জন্য ‘পাপী’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। অথচ একজন মুমিনের ভাষা হওয়া উচিত দয়া, সহমর্মিতা ও নসিহতপূর্ণ। কারণ আমরা কেউই জানি না যে, আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি কী হবে।
তাই কোনো মানুষের গুনাহ দেখে তাচ্ছিল্য না করে নিজের ঈমান ও আমলের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। বলা উচিত, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এ গুনাহ থেকে রক্ষা করেছেন। হে আল্লাহ! আমাকে শেষ পর্যন্ত হেফাজত করুন এবং আমার ভাইকে হেদায়েত দান করুন।’
মনে রাখতে হবে, একজন মুমিনের পরিচয় অন্যকে ছোট করা নয়, বরং তার কল্যাণ কামনা করা। কারণ মানুষকে লজ্জা দিয়ে নয়, ভালোবাসা, দোয়া ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশের মাধ্যমেই সত্যিকারের পরিবর্তন আনা সম্ভব। অন্যের পাপে হাসার আগে নিজের পরিণতির কথা ভাবা এবং আল্লাহর রহমতের আশ্রয় নেওয়াই একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




