পিতা-মাতার সেবা: জান্নাত লাভের অনন্য সুযোগ

প্রতীকী ছবি
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের সেবা করা, সম্মান করা, প্রয়োজন পূরণ করা এবং বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষত, পিতা-মাতা যখন বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হন, তখন তাঁদের সেবা করার মাধ্যমে সন্তানের জন্য জান্নাত অর্জনের এক বিরাট সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউ যদি এই সুযোগ পেয়েও পিতা-মাতার সেবা ও সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করতে না পারে, তবে তার চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে! এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ " . قِيلَ مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ " .
আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নাক ধূলিমলিন হোক, আবারও নাক ধূলিমলিন হোক, আবারও নাক ধূলিমলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন ব্যক্তির, হে আল্লাহর রাসুল?” তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেল, অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’
এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতা-মাতার সেবার গুরুত্ব বোঝাতে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘নাক ধূলিমলিন হোক’ কথাটি আরবি ভাষায় চরম দুর্ভাগ্য, অপমান ও ব্যর্থতা প্রকাশের একটি অভিব্যক্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করে বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছেন।
পিতা-মাতার বার্ধক্য সন্তানের জন্য শুধু দায়িত্ব পালনের সময় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক বিশেষ সুযোগ। এ বয়সে তারা শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা ও নানা প্রয়োজনের কারণে সন্তানের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হন। তাদের যত্ন নেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা, কোমল ভাষায় কথা বলা, মানসিক প্রশান্তি দেওয়া এবং যথাসাধ্য সেবা করা সন্তানের কর্তব্য। এসব কাজের মাধ্যমে সন্তান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের পথ সুগম করতে পারে।
হাদিসে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে বার্ধক্যে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কারও যদি একজন পিতা বা মাতা জীবিত থাকেন এবং তিনি তার সেবা করার সুযোগ পান, তবুও তার সামনে জান্নাত অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ খোলা রয়েছে। তাই এ সুযোগকে অবহেলা করা কোনোভাবেই উচিত নয়।
তবে পিতা-মাতার আনুগত্যেরও ইসলামে সীমা রয়েছে। তারা কোনো অন্যায় বা আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দিলে সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা যাবে না। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও তাদের সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৫)
সুতরাং, পিতা-মাতার বার্ধক্যকে বোঝা মনে না করে জান্নাত অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাদের জীবদ্দশায় সেবা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, সময় চলে গেলে অনেক সুযোগ আর ফিরে আসে না। যে সন্তান পিতা-মাতার সেবার সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারে না, সে নিজের জন্য জান্নাত অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হারায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



