মানুষের হৃদয় জয়ের নববী কৌশল

প্রতীকী ছবি
আমাদের প্রাত্যহিক জীব্যবস্থায় ছোট ছোট এমন কিছু আচরণ আছে, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অপরিসীম সৌন্দর্য ও গভীর তাৎপর্য। কারও সঙ্গে দেখা হলে মুখে হাসি ফোটানো, কোমল কণ্ঠে কথা বলা কিংবা আন্তরিকতার সঙ্গে খোঁজখবর নেওয়া মানুষের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। একটি মিষ্টি হাসি কোনো দামি উপহার নয়, অথচ তা হতাশ মানুষকে আশার আলো দেখাতে পারে, কঠিন হৃদয়কে কোমল করতে পারে এবং দূরের মানুষকে কাছে টেনে আনতে পারে। মানুষের হৃদয় জয় করার এমনই এক অসাধারণ শিক্ষা দিয়ে গেছেন বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক রাসুলুল্লাহ (সা.)।
সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত হাসিমুখ ও প্রশান্ত স্বভাবের মানুষ। তিনি মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতেন, মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতেন এবং কারও সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করতেন না। তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল মানুষের প্রতি আন্তরিকতা ও কোমলতা।
কোরআনের আলোকে সুন্দর আচরণ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৩) এ নির্দেশের মধ্যে রয়েছে শালীন ভাষা, নম্রতা, সৌজন্য ও আন্তরিকতার শিক্ষা। মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ শুধু সামাজিক ভদ্রতা নয়, বরং এটি একজন মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
এমনকি মুসা ও হারুন (আ.)-কে যখন অহংকারী ও সীমালঙ্ঘনকারী শাসক ফিরআউনের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তখনো আল্লাহ তাঁদের কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪) এ থেকে বোঝা যায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও নম্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও সদকা
মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার গুরুত্ব তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও তোমার জন্য সদকা।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)।
অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে আনন্দিত মুখে দেখা করাও সওয়াবের কাজ। এর জন্য অর্থসম্পদ ব্যয় করতে হয় না, প্রয়োজন শুধু সুন্দর মন ও আন্তরিকতা।
আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم
‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি হাসিমুখের কাউকে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৪১)।
নবীজির এই বৈশিষ্ট্য আমাদের শেখায়, মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ ও হাসিমুখে কথা বলা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
হাসির মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রভাব
আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায়ও হাসির ইতিবাচক প্রভাব উঠে এসেছে। হাসি মানুষের মানসিক চাপ কমাতে, ইতিবাচক অনুভূতি বাড়াতে এবং সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে সহায়তা করে। হাসির সময় মস্তিষ্কে বিভিন্ন স্নায়ুরাসায়নিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা আনন্দ ও প্রশান্তির অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও আন্তরিকতা তৈরি হয়। ফলে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
হাসি হোক আমাদের চরিত্রের সৌন্দর্য
একটি হাসি কখনো কখনো দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। কারও দুঃখের সময়ে আন্তরিক হাসি ও কোমল কথা তাকে মানসিক শক্তি দিতে পারে। আবার কঠোর ভাষা ও বিরূপ আচরণ সুন্দর সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি করতে পারে।
তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হাসিমুখে কথা বলা, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আচরণে নবীজির এই আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, মানুষের হৃদয় জয় করতে সব সময় বড় কোনো উপহারের প্রয়োজন হয় না; কখনো একটি আন্তরিক হাসিই যথেষ্ট। এই হাসি যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তখন তা হয়ে ওঠে সদকা ও আখিরাতের পাথেয়। আল্লাহ আমাদের সুন্দর আচরণ ও নববী আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



