হাদিসের কথা
শেষ বয়সেও কেন বাড়ে দুনিয়ার মোহ?

প্রতীকী ছবি
বয়স একসময় আমাদের সবকিছু বদলে দেয়। যে হাত একসময় শক্তিতে ভরপুর ছিল, তা কাঁপতে শুরু করে। যে চোখ দূর দিগন্তও চিনে নিত, তা ঝাপসা হয়ে আসে। যে পা জীবনভর ছুটেছে, তা একসময় লাঠির ওপর ভর করে চলে। মাথার কালো চুল রূপালি হয়ে যায়, মুখে পরিলক্ষিত হয় বয়সের রেখা। মোটকথা সময়ের পরিক্রমায় জীবনের প্রায় সবকিছুই বদলে যায়।
কিন্তু একটি জিনিস অনেক মানুষের মধ্যে বদলায় না। কখনো কখনো আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তা হলো দুনিয়ার প্রতি মোহ, আরও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং আরও বেশিদিন বেঁচে থাকার দীর্ঘ আশা।
এই বিস্ময়কর মানবিক বাস্তবতাই রাসুলুল্লাহ (সা.) চৌদ্দশ বছর আগে একটি হাদিসে তুলে ধরেছেন। আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি,
لاَ يَزَالُ قَلْبُ الْكَبِيرِ شَابًّا فِي اثْنَتَيْنِ فِي حُبِّ الدُّنْيَا وَطُولِ الأَمَلِ
‘বৃদ্ধ মানুষের হৃদয় দুটি বিষয়ে তরুণ থাকে: দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং দীর্ঘ আশা।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪২০)
এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়; এটি মানুষের মনের গভীরতম সত্যের এক অনুপম বিশ্লেষণ।
কখনো কি আমরা লক্ষ্য করেছি, একজন বৃদ্ধ মানুষ হয়তো আর নিজের হাতে এক গ্লাস পানি তুলতে পারেন না, কিন্তু নতুন জমি কেনার পরিকল্পনা করেন। হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা ছাড়তে পারেন না। চিকিৎসকের কক্ষে বসেও কেউ কেউ উত্তরাধিকার নয়, নতুন ব্যবসার হিসাব কষেন।
এটি কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়। এটাই মানুষের স্বভাব। মানুষ মনে মনে ভাবতে ভালোবাসে, ‘আরও কিছুদিন সময় আছে।’ এই ‘আরও কিছুদিন’ কথাটিই অনেক সময় তাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে বিলম্বিত করে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তাদের ছেড়ে দিন, তারা ভোগ-বিলাস করুক এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদেরকে বিভোর রাখুক। অচিরেই তারা জানতে পারবে।’ (সুরা আল-হিজর, আয়াত : ৩)
দীর্ঘ আশা তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষকে মৃত্যুর বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়।
আমরা সবাই জানি, এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকবে না। তবুও এমনভাবে জীবন সাজাই, যেন মৃত্যু অন্য কারও জন্য, আমার জন্য নয়।
পবিত্র কোরআন
আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’
(সুরা আলে ইমরান: ১৮৫)
মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। অথচ মানুষ এমন সব পরিকল্পনা করে, যার শেষ নেই। একটি বাড়ি শেষ হতে না হতেই আরেকটি বাড়ির স্বপ্ন। একটি পদ অর্জনের পর আরেকটি পদ। একটি সাফল্যের পর আরও বড় সাফল্যের দৌড়। এই দৌড়ের শেষ কোথায়?
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, হাদিসে যে ‘দীর্ঘ আশা’-র কথা বলা হয়েছে, তা সেই আশা, যা মানুষকে আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে উদাসীন করে দেয়। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা দোষের নয়; কিন্তু যেই পরিকল্পনা মৃত্যুকে ভুলিয়ে দেয়, সেটিই বিপদের কারণ।
কবরস্থানে গেলে একটি প্রশ্ন খুব নীরবে হৃদয়ে এসে দাঁড়ায়। যাদের জন্য এত দৌড়, এত সংগ্রাম, এত সঞ্চয়, তারা আজ কোথায়? তাদের ঘর আছে, কিন্তু তারা নেই। তাদের জমি আছে, কিন্তু তারা নেই। তাদের পরিচিত মানুষগুলো আছে, কিন্তু তারা নেই।
যে মানুষটি একসময় ভাবতেন, ‘আরও দশ বছর পরে বিশ্রাম নেব’, তিনি হয়তো দশ দিনও পাননি।
হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় করি দুটি জিনিসকে: প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং দীর্ঘ আশা। কারণ প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্য থেকে বিরত রাখে, আর দীর্ঘ আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।’ (ইবনু আবিদ-দুনিয়া, কিতাবুল আমাল)
ইসলাম কি স্বপ্ন দেখতে নিষেধ করেছে?
না। ইসলাম কখনো মানুষের উন্নতি, পরিশ্রম বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করেনি। ইসলাম চায় মানুষ হালাল উপায়ে উপার্জন করুক, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখুক, সমাজের উপকার করুক। কিন্তু ইসলাম একটি প্রশ্ন করতে শেখায়, এই সবকিছুর মধ্যে আমার আখিরাত কোথায়?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
অর্থাৎ প্রকৃত দূরদর্শিতা কেবল আগামী মাসের পরিকল্পনায় নয়, বরং মৃত্যুর পরের জীবনের প্রস্তুতিতে।
হয়তো আমাদের বয়স এখনও খুব বেশি হয়নি। হয়তো বার্ধক্য অনেক দূরে। কিন্তু এই হাদিস শুধু বৃদ্ধদের জন্য নয়। এটি তরুণদেরও সতর্ক করে। কারণ যে হৃদয় যৌবনে দুনিয়ার মোহে ডুবে যায়, বার্ধক্যে গিয়ে তা আরও গভীর হতে পারে।
আজ যদি আমরা হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত না করি, তবে বয়স বাড়লেও সেই হৃদয় দুনিয়ার লোভেই তরুণ থাকবে।
একদিন আমাদের চেয়ার অন্য কেউ দখল করবে। আমাদের ঘরে অন্য কেউ থাকবে। ব্যাংকের হিসাব, জমিজমা, পদমর্যাদা সবই পৃথিবীতে থেকে যাবে। শুধু সঙ্গে যাবে আমাদের ঈমান, আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা।
তাই শেষ বয়সের অপেক্ষা না করে আজই নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করা দরকার, আমার হৃদয় কি দুনিয়ার জন্য তরুণ, নাকি আখিরাতের জন্য জাগ্রত?
যেদিন এই প্রশ্নের সৎ উত্তর আমরা খুঁজে পাব, সেদিনই হয়তো দুনিয়ার মোহ কমবে, আর আখিরাতের আলো আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করবে। তখন বয়স নয়, ঈমানই হবে মানুষের প্রকৃত যৌবন।




