আগামীর সময়

মানসিক অস্থিরতা দূরীকরণে কোরআনিক সমাধান

  • মানসিক সংকটের সময়ে কুরআনের দিশা
  • অশান্ত হৃদয়ে ইসলামের প্রশান্তির পরশ
মানসিক অস্থিরতা দূরীকরণে কোরআনিক সমাধান

সংগৃহীত ছবি

অদ্ভুত এক সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা  দিনাতিপাত করছি। চারদিকে সাফল্যের গল্প, প্রযুক্তির বিস্ময় আর উন্নতির ঝলক। তার পরও মানুষের অন্তর ভরে আছে অজানা শূন্যতায়। রাত গভীর হলে কিংবা কখনো কখনো ভিড়ের মাঝেও মানুষ হঠাৎ করে একা হয়ে যায়। অকারণ দুশ্চিন্তা, নানান অস্থিরতা, অন্তহীন হতাশা আর ভয় নিঃশব্দে গ্রাস করছে অনেক মানুষকে। যদিও লহুলাংশে বাহ্যিক আরাম বেড়েছে, কিন্তু অনেকের অন্তরের শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে বহুগুণে।

এই মানসিক অস্থিরতার কারণ শুধু পার্থিব চাপ নয়; বরং একটি গভীর আত্মিক শূন্যতা। মানুষ তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক হারালে, পৃথিবীর কোনো প্রাপ্তিই তাকে স্থায়ী প্রশান্তি দিতে পারে না। পবিত্র কোরআন এই সত্যটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে বলা হয়েছে-

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।” (সূরা রা‘দ, আয়াত : ২৮)

এই আয়াত কেবল একটি আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়; এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি মৌলিক সূত্র। কারণ মানুষের হৃদয় মূলত আল্লাহমুখী; সেখান থেকে বিচ্যুতি ঘটলেই জন্ম নেয় অস্থিরতা।

বর্তমান সময়ে মানসিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ভবিষ্যৎভীতিমানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু বাস্তবতা তার হাতে থাকে না। এই দ্বন্দ্বই উদ্বেগ তৈরি করে। ইসলাম এখানে এক অনন্য ভারসাম্য শেখায়। মানুষ চেষ্টা করবে, আর ফলের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে মহান আল্লাহর ওপর।  পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা তালাক, আয়াত :৩)

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতা মানসিক চাপকে হালকা করে দেয়। কারণ তখন মানুষ বুঝতে শেখে যে, সব কিছু তার নিয়ন্ত্রণে নয়, আর সেটাই স্বাভাবিক।

মানসিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ হলো পাপ ও গুনাহের প্রভাবঅনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে না কেন তার অন্তর অশান্ত। অথচ গুনাহ হৃদয়কে ভারী করে তোলে, প্রশান্তি কেড়ে নেয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَمَن أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا

যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন হবে সংকীর্ণ ও কষ্টময়।” (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ২৪)

এই ‘সংকীর্ণতা’ কেবল আর্থিক নয়; এটি মানসিক সংকট, অস্থিরতা এবং অশান্তিরও প্রতিচ্ছবি।

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। কাজেই এতে মানসিক প্রশান্তির জন্যও রয়েছে খুবই কার্যকর সমাধান। সেগুলো হচ্ছে-

এক. সালাত বা নামাজ:

সালাত শুধু ফরজ ইবাদত নয়; এটি এক ধরনের আত্মিক থেরাপি। দিনে পাঁচবার মানুষ যখন দুনিয়ার ব্যস্ততা ছেড়ে তার রবের সামনে দাঁড়ায়, তখন তার হৃদয় ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে,

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

আমার স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।” (সূরা ত্বা-হা, আয়াত : ১৪)

দুই. দুআ ও আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত সংলাপ:

মানুষের কষ্ট যখন ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে যায়, তখন দোয়া সেই অদৃশ্য ভার লাঘব করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)  দুঃখ ও দুশ্চিন্তার সময় পড়তেন,

" اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘উযু বিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হাযান, ওয়াল-‘আজজি ওয়াল-কাসাল, ওয়াল-জুবনি ওয়াল-বুখল, ওয়া দালাআতিদ-দাইন, ওয়া গালাবাতির-রিজাল।

অর্থ: “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই- দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণভার ও মানুষের প্রভাবাধীন হওয়া থেকে।” (বুখারি, হাদিস: ৬৩৬৯)

তিন.  কৃতজ্ঞতা (শুকর):

আধুনিক মানুষ যা নেই তার জন্য কষ্ট পায়, কিন্তু যা আছে তা ভুলে যায়। অথচ কৃতজ্ঞতা হৃদয়কে প্রশান্ত করে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।” (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)

চার.  সৎকাজ ও মানুষের উপকার:

গবেষণায়ও দেখা গেছে, অন্যকে সাহায্য করলে মানসিক প্রশান্তি বাড়ে। ইসলাম বহু আগেই এই পথ দেখিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” (মু‘জামুল আওসাত লি তাবারানি, হাদিস :৫৯৩৭)

আমাদের মনে রাখতে হবে মানসিক শান্তির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিযখন মানুষ শুধু দুনিয়াকেই চূড়ান্ত মনে করে, তখন ছোট ছোট ক্ষতিও তাকে ভেঙে দেয়। কিন্তু আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে স্থির রাখে। পবিত্র কোরআনে এসেছে;

وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى

নিশ্চয়ই আখিরাতই উত্তম এবং স্থায়ী।” (সূরা আ‘লা, আয়াত : ১৭)

মানসিক অস্থিরতা কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতারই অংশ। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধান কেবল ওষুধ বা বাহ্যিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে আত্মার আহ্বান; তার স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান।

কাজেই যখন চারপাশ অস্থিরতায় ভরে ওঠে, তখন একজন মুমিন তার অন্তরে একটি নীরব আশ্রয় খুঁজে পায়; সেটি হলো আল্লাহর স্মরণ। মহান আল্লাহর সাথে ব্যক্তির এই সংযোগ যতো দৃঢ় হবে, ততোই হৃদয়ের অস্থিরতা প্রশান্তির আলোয় রূপ নেবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের হৃদয় সেই জায়গাতেই শান্তি পায়, যেখানে তার স্রষ্টার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

saifpas352@gmail.com

 

    শেয়ার করুন: