ব্যস্ত জীবনে ইবাদতের ভারসাম্য
- দুনিয়ার দায়িত্ব ও আখিরাতের প্রস্তুতি

প্রতীকী ছবি
বর্তমান যুগের মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ‘সময় নেই’। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, পড়াশোনা, সংসার, যানজট, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং সামাজিক দায়িত্বের ভিড়ে অনেকেই মনে করেন, ইবাদতের জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন। অথচ ইসলাম এমন কোনো জীবনব্যবস্থা শেখায়নি; যেখানে দুনিয়া ও আখিরাত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, দায়িত্বশীল কর্মজীবনের পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদতের ভারসাম্য বজায় রাখা।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো; আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত : ১০)। এই আয়াতে একদিকে ইবাদতের গুরুত্ব, অন্যদিকে বৈধ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম, উভয়ের সমন্বয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ইবাদতে সর্বশ্রেষ্ঠ, আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, শিক্ষক, পরিবারপ্রধান ও সমাজসংস্কারক। তিনি সাহাবিদের এমন ইবাদত থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, যা পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্বকে ব্যাহত করে। ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হে আবদুল্লাহ্! আমাকে কি এ খবর প্রদান করা হয়নি যে, তুমি রাতভর ইবাদাতে দাঁড়িয়ে থাক এবং দিনভর সিয়াম পালন কর? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, তুমি এরূপ করো না, বরং সিয়ামও পালন কর, ইফতারও কর, রাত জেগে ইবাদাত কর এবং নিদ্রাও যাও। তোমার শরীরেরও তোমার ওপর হক আছে; তোমার চোখেরও তোমার ওপর হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর হক আছে। (বুখারি, হাদিস: ৫১৯৯)। এ হাদিস ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরেছে।
ব্যস্ততার মধ্যেও ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ফরজ ইবাদতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা, প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত করা সম্ভব হলে অর্থসহ অধ্যয়ন করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকিরগুলো পড়ার চেষ্ঠা করা এবং ঘুমানোর আগে আত্মসমালোচনার অভ্যা গড়ে তোলা। একজন মুসলিম নিজ জীবনে এতোটুকু ইবাদর মুখর হতে পারলেই আশা করা যায় তার আধ্যাত্মিক শক্তি অটুট রাখতে সক্ষম হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ইসলামে বৈধ উপার্জন, পরিবারের ভরণপোষণ, মানুষের উপকার এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করাও সওয়াবের কারণ হতে পারে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি, হাদিস: ১)। তাই কর্মব্যস্ত জীবনও সৎ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন, মানুষের প্রকৃত সফলতা হলো এমন জীবন, যেখানে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে জীবিত থাকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে। (মাদারিজুস সালিকীন)
ব্যস্ততা জীবনের বাস্তবতা, কিন্তু আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার অজুহাত নয়। বরং সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, আন্তরিক নিয়ত এবং নিয়মিত ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুসলিম দুনিয়ার দায়িত্ব ও আখিরাতের প্রস্তুতির মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য গড়ে তুলতে পারেন। এই ভারসাম্যই একজন মুমিনের সফল, প্রশান্ত ও অর্থবহ জীবনের ভিত্তি।




