স্ক্রিনের আড়ালের গুনাহও কি আমলনামায় লেখা হয়?

প্রতীকী ছবি
প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের জীবনের বড় একটি অংশ এখন স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটনির্ভর। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদন থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল মাধ্যমের উপস্থিতি দৃশ্যমান। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক নৈতিক চ্যালেঞ্জ। বাস্তব জীবনের পাশাপাশি এখন মানুষের একটি ‘ডিজিটাল জীবন’ও গড়ে উঠেছে, যেখানে অনেকেই এমন কিছু কাজ করে বসেন, যা হয়তো সামনাসামনি করতে সংকোচ বোধ করতেন। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার আড়ালে সংঘটিত গুনাহ কি বাস্তব জীবনের গুনাহের মতোই আল্লাহর কাছে গণ্য হবে?
ইসলামের দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। শরিয়ত কোনো কাজের বিচার তার মাধ্যম দেখে করে না; বরং বিচার করে কাজটির প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও প্রভাবের ভিত্তিতে। তাই কেউ যদি মুখে মিথ্যা বলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়, উভয় ক্ষেত্রেই সে মিথ্যার গুনাহে দোষী হবে। কেউ যদি সরাসরি কারও গিবত করে কিংবা ফেসবুক পোস্টে, মন্তব্যে বা অনলাইন আলোচনায় তার সম্মানহানি করে, উভয় কাজই ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কর্ম সম্পর্কে অবগত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে একজন প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা কাফ, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার সময় স্মার্টফোন, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। কিন্তু আয়াতটির শিক্ষা সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। মানুষের মুখের কথার মতোই তার লিখিত শব্দ, অনলাইন মন্তব্য, বার্তা ও পোস্টও তার আমলের অন্তর্ভুক্ত। বরং বর্তমান যুগে মানুষের অনেক বক্তব্য মুখের চেয়ে আঙুলের মাধ্যমে বেশি প্রকাশিত হয়। তাই কীবোর্ডে লেখা শব্দ কিংবা স্ক্রিনে স্পর্শ করে ছড়িয়ে দেওয়া তথ্যও আল্লাহর কাছে গোপন নয়।
বরং অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত গুনাহ বাস্তব জীবনের গুনাহের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। কারণ বাস্তব জীবনে একজন ব্যক্তি সীমিত সংখ্যক মানুষের কাছে মিথ্যা বা অপবাদ পৌঁছাতে পারে, কিন্তু অনলাইনে একটি পোস্ট, ভিডিও বা বার্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজারো বা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি অপপ্রচার, একটি গুজব কিংবা একটি চরিত্রহননমূলক বক্তব্য মুহূর্তেই ব্যাপক সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি মিথ্যা খবর কখনও মানুষের সম্মান নষ্ট করেছে, কখনও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, আবার কখনও নিরপরাধ মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করেছে।
এ কারণেই ইসলাম শুধু গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বলে না, বরং গুনাহের বিস্তার ঘটানো থেকেও সতর্ক করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
مَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ
‘যে ব্যক্তি মানুষকে ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করে, তার ওপর অনুসারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে, অথচ তাদের গুনাহ থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৭৪)
এই হাদিসের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায়, কেউ যদি অশ্লীলতা, মিথ্যা, বিদ্বেষ বা বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু অনলাইনে ছড়িয়ে দেয় এবং মানুষ তা দেখে বা অনুসরণ করে, তাহলে তার দায় কেবল নিজের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সেই প্রভাবের অংশও তার আমলনামায় যুক্ত হতে পারে।
ডিজিটাল যুগের আরেকটি বড় বিপদ হলো গোপন পাপের সহজলভ্যতা। অনেক মানুষ মনে করেন, একা ঘরে বসে মোবাইল ব্যবহার করার সময় তাকে কেউ দেখছে না। কিন্তু একজন মুমিনের ঈমানের দাবি হলো, সে বিশ্বাস করবে যে, মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى
‘সে কি জানে না যে আল্লাহ তাকে দেখছেন?’ (সুরা আলাক, আয়াত : ১৪)
প্রকৃতপক্ষে ডিজিটাল জগত মানুষের তাকওয়ার একটি নতুন পরীক্ষাক্ষেত্র। মসজিদে, কর্মস্থলে বা জনসমক্ষে নিজেকে সংযত রাখা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু নির্জনে, হাতে স্মার্টফোন নিয়ে বসে থাকা অবস্থায় নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা অনেক বেশি কঠিন। এ কারণেই প্রকৃত আল্লাহভীতি প্রকাশ পায় তখন, যখন মানুষ এমন অবস্থায়ও নিজেকে সংযত রাখে, যেখানে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার মতো কোনো মানুষ উপস্থিত নেই।
ডিজিটাল গুনাহের একটি বিশেষ দিক হলো এর স্থায়িত্ব। মুখের একটি কথা কিছু সময় পরে মানুষ ভুলে যেতে পারে; কিন্তু ইন্টারনেটে আপলোড করা একটি ছবি, ভিডিও, পোস্ট বা মন্তব্য বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে। এমনকি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পরও তার প্রচারিত বিষয়বস্তু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। যদি তা মানুষকে গুনাহের দিকে প্রভাবিত করে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাবও অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণেই অনলাইন জগতে প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি শেয়ার এবং প্রতিটি প্রকাশনা সম্পর্কে একজন মুসলিমের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি মাধ্যম মাত্র। যে হাত দিয়ে গুনাহ ছড়ানো যায়, সেই হাত দিয়েই কোরআনের শিক্ষা, হাদিসের বাণী, উপকারী জ্ঞান, মানবসেবার আহ্বান ও কল্যাণকর বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। একই স্মার্টফোন একজন মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে, আবার সওয়াবেরও বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রক না বানিয়ে বরং প্রযুক্তিকে কল্যাণের কাজে নিয়োজিত করা।
আজকের যুগে যেমন আর্থিক তাকওয়া, সামাজিক তাকওয়া ও পারিবারিক তাকওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন ‘ডিজিটাল তাকওয়া’র। অর্থাৎ অনলাইন জগতেও এমন আচরণ করা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী। কারণ বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগত মানুষের কাছে আলাদা মনে হলেও আল্লাহর কাছে উভয়ই সমানভাবে দৃশ্যমান। মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু আমলনামাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। স্ক্রিনের আড়ালে সংঘটিত প্রতিটি ভালো কাজ যেমন সওয়াবের খাতায় লেখা হয়, তেমনি প্রতিটি গুনাহও হিসাবের খাতায় সংরক্ষিত থাকে। তাই একজন সচেতন মুসলিমের জন্য স্মার্টফোনের স্ক্রিন শুধু প্রযুক্তির জানালা নয়, বরং আখিরাতের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




