সাহাবি ও তাবেয়ী যুগের ঈদ আনন্দ

প্রতীকী ছবি
ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ হলো সাহাবি ও তাবেয়ীদের যুগ। যে যুগকে নবী (সা.) নিজেই “খাইরুল কুরূন” বা শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই যুগের প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি আচরণ ছিল সরাসরি নববী শিক্ষার প্রতিফলন। ঈদ উদযাপনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বরং তাদের ঈদ ছিল সরলতা, তাকওয়া, ইবাদত ও মানবিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
ঈদের সূচনা হতো চাঁদ দেখার মাধ্যমে। সাহাবায়ে কিরাম চাঁদ দেখার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন এবং তা প্রমাণিত হলে একে অপরকে জানাতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “লোকেরা চাঁদ দেখার চেষ্টা করছিল, তখন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানালাম যে, আমি চাঁদ দেখেছি। তখন তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং লোকদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।” (আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৪২) এই সতর্কতা ঈদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। সাহাবাগণ চাঁদ দেখে ঈদ পালন করতেন।
ঈদের দিন সাহাবিরা সুন্নাহ অনুযায়ী গোসল করতেন, উত্তম পোশাক পরিধান করতেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। ইবনে উমর (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি ঈদের দিন গোসল করতেন এবং সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। (মুআত্তা মালিক) এটি প্রমাণ করে, ঈদের দিন নিজেকে পরিপাটি রাখা ছিল তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
ঈদুল ফিতরের দিন তারা নামাজে যাওয়ার আগে কিছু খেজুর খেতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর তিনি তা বেজোড় সংখ্যায় খেতেন।” (বুখারি, হাদিস: ৯৫৩) সাহাবিরাও এই সুন্নাহ যথাযথভাবে অনুসরণ করতেন। কাজেই আমাদের ঈদুল ফিতরের নামাজে যাওয়ার আগে খেজুর বা কোনো মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা উচিত। এতে সুন্নতের অনুসরণ করা হবে।
ঈদের নামাজ আদায় ছিল তাদের ঈদের দিনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তারা খোলা ময়দানে একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করতেন। পুরুষ, নারী এমনকি কিশোর-কিশোরীরাও এতে অংশগ্রহণ করত। উম্মে আতিয়্যা (রা.) বলেন, “আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হতো যেন আমরা ঈদের দিনে কুমারী মেয়ে, পর্দানশীন নারী এবং ঋতুবতী নারীদেরও (ঈদগাহে) নিয়ে যাই, যাতে তারা মুসলমানদের দোয়া ও কল্যাণে অংশগ্রহণ করতে পারে।” (বুখারি, হাদিস: ৯৭১; মুসলিম, হাদিস: ৮৯০) তবে আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে ঈদের জামাতে শরীক না হওয়াই উত্তম।
ঈদের দিন তারা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে প্রচলিত দোয়া ছিল—
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম
অর্থাৎ, “আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের (ইবাদত) কবুল করুন।” (বায়হাকী, হাদিস: ৬০৩৩)
এই দোয়ার মাধ্যমে তারা কেবল আনন্দ প্রকাশ করতেন না; বরং একে অপরের আমল কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করতেন, যা ঈদের প্রকৃত চেতনাকে তুলে ধরে।
সাহাবাগণের ঈদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দরিদ্রদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। ঈদুল ফিতরের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করে তারা নিশ্চিত করতেন, যেন গরিব মানুষও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) যাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারের অনর্থক কথা ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)
তাবেয়ীদের যুগেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। তারা সাহাবিদের অনুসরণে ঈদের দিনকে ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির দিনে পরিণত করতেন। হাসান বসরী (রহ.) বলেন, “প্রত্যেক সেই দিনই ঈদ, যেদিন আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয় না।” এই উক্তি স্পষ্ট করে যে, তাদের কাছে ঈদ কেবল আনন্দের দিন ছিল না; বরং এটি ছিল আত্মসংযম ও তাকওয়ার প্রতিফলন।
ঈদের দিনে তারা অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা বা অপচয়ে লিপ্ত হতেন না। বরং সংযম বজায় রেখে বৈধ আনন্দ উপভোগ করতেন। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত করাই ছিল তাদের ঈদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই যুগের ঈদ উদযাপন আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরে। আজ আমরা অনেক সময় ঈদকে কেবল পোশাক, খাবার ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। অথচ সাহাবি ও তাবেয়ীদের ঈদ ছিল ইবাদতনির্ভর, মানবিক ও পরিমিত।
অতএব, আমাদের উচিত সেই স্বর্ণযুগের ঈদ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। ঈদ হোক সুন্নাহর অনুসরণে, দোয়া ও ইবাদতে সমৃদ্ধ, এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় পূর্ণ। তখনই আমাদের ঈদ হবে সত্যিকারের অর্থবহ—যে ঈদ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে সহায়ক।
লেখক: শিক্ষার্থী, এন. আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।

