মৃতের জানাজার অধিকার কতটা?

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবদ্দশায় নানা ভুল, অপরাধ ও বিতর্ক থাকতে পারে। কারও কর্মকাণ্ডে সমাজ ক্ষুব্ধ হতে পারে; তার প্রতি মানুষের ঘৃণা বা অনাস্থাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর তার জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে বিরোধ কতটা সঙ্গত? কোনো ব্যক্তির জীবন বিতর্কিত হওয়ার কারণে তার জানাজা বয়কট করা কিংবা অন্যদের জানাজায় অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য? প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলাম মৃত ব্যক্তির প্রতিও জীবিতদের কিছু দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে।
জানাজা একজন মুসলিমের প্রতি মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফিকহের পরিভাষায় এটি ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ সমাজের কিছু মানুষ তা আদায় করলে অন্যরা দায়িত্বমুক্ত হন। জানাজার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَا مِنْ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيَقُومُ عَلَى جَنَازَتِهِ أَرْبَعُونَ رَجُلاً لاَ يُشْرِكُونَ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ شَفَّعَهُمُ اللَّهُ فِيهِ
কোনো মুসলিমের জানাজায় এমন ৪০জন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করেন না, তাহলে আল্লাহ মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করেন। (মুসলিম, হাদিস: ৯৪৮)
পবিত্র কোরআনেও মৃত ব্যক্তির জানাজা প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ
‘আর তাদের মধ্য থেকে কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তার জানাজার নামাজ পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ৮৪)। আয়াতটি বিশেষভাবে মুনাফিকদের সম্পর্কে অবতীর্ণ। তাই এটিকে সাধারণভাবে প্রত্যেক পাপী বা বিতর্কিত মুসলিমের জানাজা বর্জনের দলিল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। কারণ হয়তো মৃত ব্যক্তির জীবনাচার কোনো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কিন্তু আজকের দিনে অন্য যারা কোনো শরয়ী ওজর ছাড়া তার জানাজা বর্জন করছেন তারাও কি নবী ও সাহাবা আদর্শের ওপর শতভাগ আছেন?
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। কোনো ব্যক্তি গুনাহ করেছেন, অন্যায় করেছেন কিংবা মানুষের কাছে অপ্রিয় হয়েছেন; এ কারণে তার জানাজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। যতক্ষণ তার ইসলাম অস্বীকার করে মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি শরিয়তসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়; ততক্ষণ শুধু ব্যক্তিগত বিরাগ বা অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জানাজার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। তার কাজের বিচার আলাদা বিষয়, আর জানাজার বিধান আলাদা বিষয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ঋণগ্রস্ত এক মৃত ব্যক্তিকে আনা হলে তিনি প্রথমে তার জানাজা পড়াননি। পরে আবু কাতাদা (রা.) তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিলে নবীজি (সা.) তার জানাজা পড়ান। (বুখারি, হাদিস: ২২৮৯; মুসলিম, হাদিস: ১৬১৯)। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে জানাজায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া আর অন্যদের জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো ব্যক্তি নিজস্ব বিবেচনায় জানাজায় না-ও যেতে পারেন। কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি জানাজায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। কিন্তু অন্যদের চাপ প্রয়োগ করে কিংবা জানাজার আয়োজন বানচাল করে দেওয়া ভিন্ন বিষয়। এ ধরনের আচরণে মৃত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি জুলুম এবং মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি বলে গণ্য হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَ لَا یَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَاٰنُ قَوۡمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعۡدِلُوۡا ؕ اِعۡدِلُوۡا ۟ هُوَ اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ۫
‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো। এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত :৮)। আয়াতটির শিক্ষা হলো, বিরোধ বা বিদ্বেষের কারণেও ন্যায়সংগত আচরণ থেকে সরে আসা যাবে না।
অতএব, কারও জীবনের অন্যায়কে সমর্থন করা আর মৃত্যুর পর তার জানাজা ও দাফনের অধিকারকে সম্মান করা এক বিষয় নয়। অপরাধের প্রতিবাদ হতে পারে, আইন অনুযায়ী বিচারও হতে পারে। কিন্তু মৃতের জানাজাকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো কিংবা তার পরিবারকে অযথা হয়রানি করা ন্যায় ও মানবিকতার পরিপন্থী। জীবিতের কর্মকাণ্ডের বিচার করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা মানুষের থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং চূড়ান্ত পরিণতির বিচার আল্লাহর হাতে। তাই বিতর্কিত ব্যক্তির জানাজার ক্ষেত্রেও আবেগ নয়, কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা ও ন্যায়বোধই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



