সন্তান সফল কিন্তু মানুষ নয় কেন
- সন্তানকে সফল নয়, মানুষ বানান
- মানবিক সন্তান গড়াই আসল সফলতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্তমান সময়ের পিতা-মাতাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হলো সন্তানের ভবিষ্যৎ। কে কোন স্কুলে পড়বে, কত GPA পাবে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে কত বড় চাকরি করবে, সমাজে কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে; এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত চলছে অঘোষিত প্রতিযোগিতা। সন্তানকে সফল দেখতে চাওয়া অবশ্যই স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু সন্তানকে শুধু সফল বানাতে চাওয়ার মানসিকতার চেয়ে একজন ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে চাওয়াটা বেশি প্রয়োজন।
আজ সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানবিক মানুষের সংকটও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, অর্থবান ও প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু আচরণে রূঢ়, আত্মকেন্দ্রিক ও দায়িত্বহীন। কেউ বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করছে, কেউ অসহায় মানুষের প্রতি নির্মম, কেউ ক্ষমতা বা অর্থের অহংকারে অন্যকে ছোট করছে। এর অন্যতম কারণ হলো, পরিবারগুলোতে সফলতার শিক্ষা দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই মানবিকতার শিক্ষা দেয়া হচ্ছে না।
ইসলাম সন্তানের লালন-পালনকে শুধু পার্থিব সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং ঈমান, চরিত্র, আদব ও মানবিকতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত : ৬)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, পিতা-মাতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা নয়; বরং তাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে গড়ে তোলাও তাদের কর্তব্য।
পবিত্র কোরআনে লুকমান (আ.)-এর উপদেশের বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তার সন্তানকে প্রথমেই শিখিয়েছেন আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করতে। এরপর নামাজ কায়েম, ভালো কাজের আদেশ, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, ধৈর্য ধারণ এবং মানুষের সঙ্গে বিনয়ী আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ একজন আদর্শ পিতা সন্তানের মধ্যে শুধু দক্ষতা নয়, চরিত্র ও মূল্যবোধও গড়ে তোলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্রের চেয়ে উত্তম উপহার দিতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫২)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দামি পোশাক, প্রযুক্তি বা সম্পদের চেয়েও মূল্যবান হলো সুন্দর আখলাক ও আদবের শিক্ষা।
বর্তমানে অনেক পরিবারে সন্তানের সামনে একটি ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে। তাকে শেখানো হচ্ছে, ‘জীবনে বড় হতে হবে’, কিন্তু শেখানো হচ্ছে না, ‘ভালো মানুষও হতে হবে।’ ফলে সন্তান হয়তো ক্যারিয়ারে সফল হচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরে কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হচ্ছে না। সে হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, গরিব মানুষের কষ্ট কীভাবে বুঝতে হয়, সেটি শিখছে না।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে পরিবার থেকে। পিতা-মাতা নিজেরা যদি সত্যবাদী, নম্র, দায়িত্বশীল ও দয়ালু হন, তাহলে সন্তানও ধীরে ধীরে সেসব গুণ গ্রহণ করে। বিপরীতে পরিবারে যদি অহংকার, মিথ্যা, গালি বা অশান্তি থাকে, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব সন্তানের মনেও পড়ে। তাই সন্তানকে মানুষ করতে চাইলে আগে পরিবারকে মানুষ হওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আরেকটি বড় সংকট হলো পারিবারিক সময় কমে যাওয়া। অনেক পিতা-মাতা সন্তানের জন্য দামি ফোন কিনে দিচ্ছেন, কিন্তু তার সঙ্গে বসে কথা বলার সময় বের করতে পারছেন না। ফলে সন্তান ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ একটি শিশুর মানসিক বিকাশে পিতা-মাতার সান্নিধ্য, গল্প, উপদেশ ও ভালোবাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন, শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো তার শৈশব। এই সময় সে যা দেখে, যা শোনে এবং যেভাবে বড় হয়, ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্বেও তার গভীর প্রভাব পড়ে। তাই ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সালাম দেওয়া, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, মিথ্যা না বলা, অন্যের কষ্ট বোঝা ও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দিতে হবে।
ইসলামে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন নয়; বরং আল্লাহকে জানা, মানুষকে উপকার করা এবং ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলা। তাই এমন শিক্ষা অর্থহীন, যা মানুষকে অহংকারী করে তোলে; কিন্তু মানবিক করে না।
আজ সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, উচ্চশিক্ষিত কেউ দুর্নীতিতে জড়াচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, কিংবা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু ডিগ্রি মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানাতে পারে না। মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার চরিত্র, আচরণ ও নৈতিকতায়।
একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে পরিবার থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে। সন্তানকে শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কর্মকর্তা বানানোর স্বপ্ন দেখলে চলবে না। তাকে সত্যবাদী, আমানতদার, বিনয়ী ও মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। কারণ একজন ভালো মানুষ শুধু নিজের জীবনই সুন্দর করে না। সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও আলোকিত করে।
পৃথিবীতে সফল মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু প্রকৃত মানুষ হওয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না। তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা শুধু অর্থ বা পদ নয়। উত্তম চরিত্র ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ একজন মানুষ হয়ে ওঠাই বড় সফলতা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




