Agamir Somoy E-Paper
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
মানুষের সেবায় মহেববুলের ৫৪ বছর
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

advertiseadvertise
আগামীর সময় ইসলাম

নজরুল রচনায় ইসলামচিন্তা

  • নজরুলের সাহিত্যকর্মে ইসলামী জীবনদর্শনের প্রতিফলন
  • নজরুলের রচনায় ইসলামের নান্দনিক ও মানবিক রূপ
  • নজরুলের কবিতায় ইসলামচেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ
মুফতি সাইফুল ইসলাম
মুফতি সাইফুল ইসলাম
agamir somoy
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৬:১৮
নজরুল রচনায় ইসলামচিন্তা

সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ আসেন, যাদের জীবনকাল সীমিত হলেও তাদের সৃষ্টিকর্মের আয়ু হয় অনন্ত। তারা চলে যান, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া শব্দ, চিন্তা ও স্বপ্ন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলো দেখায়। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক বিরল প্রতিভা। বাংলা সাহিত্যে তিনি পরিচিত বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি হিসেবে। একই সঙ্গে তিনি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলা এক শক্তিমান কণ্ঠ হিসেবেও সমান সমাদৃত। তার রচনায় ব্যাপকভাবে চিত্রিত হয়েছে ইসলানের নানা অনুষঙ্গ।

নজরুলের ইসলামচিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার নিজের আত্মপরিচয়। তিনি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে কখনো করেননি সংকোচ বোধ। তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় আল্লাহ, রাসুল (সা.), কোরআন, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, ঈদ, কোরবানি, মক্কা-মদিনা, কারবালা ও ইসলামের ইতিহাসের নানা চরিত্র বারবার ফিরে এসেছে। ‘আমার লীগ-কংগ্রেস’ নামক রাজনৈতিক প্রবন্ধে তার বিখ্যাত ঘোষণা, ‘আল্লাহ আমার প্রভু, রাসুলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক’ তাঁর ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের একটি স্পষ্ট দলিল। যেখানে তিনি ইসলামকে নিজ জন্মগত পরিচয়ের পাশাপাশি জীবন পরিচালনার পথ হিসেবেও ঘোষণা করেছেন।

এই বিশ্বাসেরই কাব্যিক প্রকাশ দেখা যায় তাঁর মোবারকবাদ কবিতায়—

আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে কভু শির করিয়ো না নিচু,
এক আল্লাহ কাহারও বান্দা হবে না, বলো।

এই উচ্চারণের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের তাওহিদ ও মানুষের মর্যাদাবোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)। পবিত্র কোরআনে মানুষকে সম্মানিত সৃষ্টির মর্যাদা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমি আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি ’। (সুরা ইসরা, আয়াত : ৭০) নজরুলের কবিতায় আল্লাহর কাছে মাথা নত করা এবং মানুষের কাছে অন্যায়ভাবে মাথা না নোয়ানোর যে আহ্বান, তার ভেতরে এই তাওহিদ ও মানবমর্যাদার চেতনা প্রকাশ পেয়েছে।

নজরুলের ইসলামচিন্তায় দেখা যায় ঈমান তার কাছে মানুষকে সাহসী করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। এ কারণেই তার ইসলামী কবিতার ভাষা অনেক সময় বজ্রের মতো, আহ্বান কখনো দামামার মতো, আবার তার বিশ্বাস কখনো ঝড়ের মধ্যে অটল নৌকার মতো।

খেলাফত ও মুসলিম জাগরণধর্মী বিভিন্ন রচনায় তার কণ্ঠে যে সংগ্রামী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে, তার একটি উদাহরণ হচ্ছে—

বাজিছে দামামা, বাঁধো রে আমামা,
শির উঁচু করি মুসলমান।
দাওয়াত এসেছে নয়া জমানার,
ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান।

এখানে ‘শির উঁচু’ করা নিছক অহংকার নয়; আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। পাবিত্র কোরআন মুমিনকে অন্যায়ের সামনে নত না হওয়ার শিক্ষা দেয়। ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও’। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৯)। নজরুল রচনায় কোরআনে ঘোষিত এই আত্মবিশ্বাসী ঈমানেরই সাহিত্যধ্বনি প্রকাশ পায়।

নজরুল রচনায় পবিত্র কোরআনের উপস্থিতি শুধু উদ্ধৃত আয়াত বা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনের ন্যায়, সাম্য, সত্য, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের দর্শন তার চিন্তা ও রচনায় শব্দের পরতে পরতে মিশে আছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে রচিত তার বিখ্যাত প্রবন্ধ রাজবন্দীর জবানবন্দীতে তিনি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে স্বাধীনতা ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাকে দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। সেখানে তার আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, ‘আমি সত্যের সৈনিক’ ধরনের বক্তব্য তার সামগ্রিক নৈতিক অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করে। যা পবিত্র কোরআনের মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশেরই সামঞ্জস্যপূর্ণ সাহিত্যরূপ। কোরআনে বলা হয়েছে- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয় (সুরা নিসা, আয়াত : ১৩৫)।’

নজরুলের ইসলামচিন্তায় কারবালা একটি বিশেষ প্রতীক। ‘মোহররম’ কবিতায় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে তিনি শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি; সত্যের জন্য আত্মত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার কবিতায় কারবালার প্রান্তর শুধু ইতিহাসের অধ্যায় নয় বরং প্রতিটি যুগের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রশ্ন; অন্যায় যখন শক্তিশালী, তখন সত্যের পক্ষে কে দাঁড়াবে?

কোরআন সরাসরি কারবালার ঘটনা বর্ণনা করেনি। তাই নজরুলের কারবালা-চেতনার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট আয়াতকে জুড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কোরআনের যে নীতি, তার সঙ্গে কারবালার নৈতিক শিক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী’। (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮)। নজরুলের কারবালা-ভাবনায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার যে আহ্বান, সেটিই আয়াতের মূল ভাষ্য।

নজরুলের ইসলামচিন্তার আরেকটি আবেগময় অধ্যায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা। ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম, মরুভাস্করসহ বিভিন্ন রচনায় তিনি রাসুল (সা.)-কে মানবতার মুক্তিদূত হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তার কাছে নবীপ্রেম ছিল একটি বড় আবেগের জায়গা। তিনি চিত্রায়ণ করতে চেষ্ঠা করেছেন যে, নবীজির জীবন ছিল ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার আদর্শ।

কোরআন মহানবী (সা.) সম্পর্কে বলেছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’। (সুরা আহযাব, আয়াত ২১)। আর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি’। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)। নজরুলের নবীপ্রেমের অন্যতম সৌন্দর্য এখানেই যে, তাঁর কাছে রাসুল (সা.) শুধু মুসলমানের নেতা নন, মানবতার কল্যাণের জন্য প্রেরিত এক মহান আদর্শ।

নজরুলের সাহিত্যজগতের অন্যতম প্রধান শব্দ ‘সাম্য’। এই সাম্যবাদ তার রাজনৈতিক ও মানবতাবাদী চিন্তার অংশ হলেও ইসলামের সাম্যনীতিও তার কল্পনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি ধর্ম, জাতি ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন—

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।

এই পঙ্‌ক্তি তার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দর্শনের এক অনন্য প্রকাশ। কোরআন মানুষের জাতিগত ও সামাজিক বিভাজনকে পরিচয়ের জন্য স্বীকার করলেও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে তাকওয়াকে নির্ধারণ করেছে: বলা হয়েছে ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)। নজরুলের সাম্যচেতনায় এই মানবিক মর্যাদার বোধ বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণেও বংশ, বর্ণ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)। নজরুলের রচনায় দেখা যায়, মানুষের মূল্যায়নও বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানবিক মর্যাদা ও কর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

নজরুলের রচনায় জাকাতকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয় সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি সম্পদকে ব্যক্তিগত ভোগের একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে দেখেননি। তার ‘জাকাত’ বিষয়ক গানে তিনি ধনীদের উদ্দেশে বলেছেন—

দে জাকাত দে জাকাত তোরা দেরে জাকাত,
তোর দিল খুলবে পরে, ওরে আগে খুলুক হাত।
ভোগের তরে আসেনি দুনিয়ায় মুসলমান,
তোর একার তরে দেননি খোদা দৌলতের খেলাত।

এই বক্তব্যের সঙ্গে কোরআনের অর্থনৈতিক ন্যায়বোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন জাকাতকে ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩; সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)। আর সম্পদ সম্পর্কে বলেছে, ‘যাতে তা তোমাদের ধনীদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত না হয়’। (সুরা হাশর, আয়াত : ৭)। নজরুলের ভাষায় তাই জাকাত ধনীর হাত থেকে দরিদ্রের ঘরে পৌঁছানো শুধু অর্থ নয়; এটি হৃদয়ের দরজা খোলারও শিক্ষা।

নারীর মর্যাদা নিয়েও নজরুল তার সময়ের তুলনায় অত্যন্ত প্রগতিশীল অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘নারী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—

নারীরে প্রথম দিয়াছি মুক্তি নর-সম অধিকার,
মানুষে গড়া প্রাচীর ভাঙিয়া করিয়াছি একাকার।

নজরুলের নারীচেতনার সঙ্গে ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক মানবিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। কোরআন পুরুষ ও নারী উভয়কেই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্বের অংশীদার করেছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু; তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজে নিষেধ করে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৭১)। উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ও বিবাহের ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীর স্বতন্ত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে (সুরা নিসা, আয়াত: ৭, ১৯)। ফলে নজরুলের নারী-মর্যাদার ভাবনার সঙ্গে ইসলামের মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক নারী-দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য দেখা যায়।

নজরুল বাংলা ভাষায় ঈদ ও রমজানের এমন এক কাব্যিক আবহ সৃষ্টি করেছেন, যা বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে রোজার আত্মসংযমের পর ঈদের আনন্দ শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি ঘরে ঘরে, হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়া সাম্যের আনন্দ।

রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোরআন বলেছে, ‘যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)। নজরুলের রমজান ও ঈদবিষয়ক রচনায়ও ক্ষুধার অভিজ্ঞতা, সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আনন্দের সামাজিক ভাগাভাগি সমভাবে চিত্রিত হতে দেখা যায়। তার কাছে ঈদ শুধু নতুন পোশাকের উৎসব নয়; বরং দীর্ঘ সংযমের পর হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার উৎসব।

নজরুল তার ‘কোরবানি’ কবিতায় কোরবানির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে রক্তপ্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ  রাখেননি। তিনি লিখেছেন—

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।

এই ব্যাখ্যাটি কোরবানির আধ্যাত্মিক মর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)। অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা পশু জবাইয়ের বাহ্যিকতায় নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগ ও আনুগত্যে। নজরুল কাব্যিক ভাষায় কোরবানির এই আহ্বানই তুলে ধরেছেন।

নজরুলের রচনার আরও একটি বড় ইসলামিক সৌন্দর্য হলো, তিনি মুসলিম আত্মপরিচয়কে দৃঢ় করলেও তা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষে পরিণত হতে দেননি। তার ‘হিন্দু-মুসলমান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো রচনায় তিনি বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কাছে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক ছিল একই ভূখণ্ডের মানুষের জীবন-সম্পর্ক।

কোরআন ন্যায় ও সদাচরণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য না করতে শেখায়। যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি বা তাদের ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায় করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)। মহানবী (সা.)-এর জীবনেও অমুসলিম প্রতিবেশী, নাগরিক ও মানুষের সঙ্গে ন্যায় ও মানবিক আচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নজরুলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাহিত্যিক অবস্থান এই বৃহত্তর ইসলামী ন্যায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নজরুলের রচনায় ‘জিহাদ’ শব্দটি এসেছে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আবহে। তবে তার রচনাকে বুঝতে গিয়ে জিহাদকে শুধু যুদ্ধ অর্থে ব্যাখ্যা করা অনুচিত। কোরআনে জিহাদের বহুমাত্রিক অর্থ ও প্রয়োগ রয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর পথে যে কোনো কাজের চেষ্টাও এর অংশ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা আমার পথে সর্বাত্মক চেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখাব।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)।

নজরুলের বিদ্রোহী চেতনায় এই সংগ্রামী দিকটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। তার বিদ্রোহ ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য নয়; শোষণ, অন্যায়, পরাধীনতা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—

আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

এখানে ইসলামী ইতিহাস ও পৌরাণিক-সাংস্কৃতিক নানা প্রতীক পাশাপাশি এসেছে। ফলে নজরুলের কাব্যভাষা কোনো একক ধর্মীয় অভিধানে আবদ্ধ নয়; বরং তাঁর বিদ্রোহ বৃহত্তর মানবমুক্তির ভাষা।

নজরুলের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক কৃতিত্বগুলোর একটি হলো, তিনি বাংলা কবিতার প্রচলিত শব্দভাণ্ডারে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিপুল উপাদানকে শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। মক্কা, মদিনা, কারবালা, বদর, উহুদ, হিজরত, আজান, কোরআন, নামাজ, রোজা, জাকাত, ঈদ, কোরবানি, আল্লাহ, রাসুল, সাহাবি, হুসাইন, আলি, বেলাল, উমর, খালিদ এসব তার কাব্যে কেবল ধর্মীয় শব্দ নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে কাব্যিক প্রতীক ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উপাদান।

‘বদর’ কবিতায় ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের যুদ্ধকে তিনি সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ‘শাত-ইল-আরব’ কবিতায় আরবভূমি ও ইসলামের ঐতিহাসিক স্মৃতি তার কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। ‘মরুভাস্কর’ কবিতায় মহানবী (সা.)-এর জীবনকে কেন্দ্র করে নজরুলের কাব্যনির্মাণ বাংলা সাহিত্যে ইসলামী জীবনদর্শনের এক অনন্য সংযোজন।

আসলে নজরুলের রচনায় ইসলামচিন্তা কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। তার সাহিত্যিক সত্তার গভীরে প্রবাহিত একটি শক্তিশালী জীবনদর্শন। কোথাও ইসলাম তার কাছে অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপ, কোথাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে উত্থিত তরবারি, কোথাও ক্ষুধার্তের মুখে পৌঁছে যাওয়া জাকাতের অন্ন, কোথাও কারবালার রক্তে লেখা সত্যের ইতিহাস, আবার কোথাও ঈদের চাঁদের মতো সব মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়া আনন্দ।

এই কারণেই নজরুলের ইসলামী রচনা শুধু ধর্মীয় আবেগের সাহিত্য নয়; তা এক আত্মজাগরণের সাহিত্য। তার শব্দে কখনো আজানের সুর, কখনো কারবালার কান্না, কখনো বদরের দামামা, কখনো রমজানের সংযম, কখনো ঈদের আনন্দ, আবার কখনো মজলুম মানুষের আর্তনাদ একাকার হয়ে গেছে। বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাসে নজরুল তাই শুধু একজন কবি নন, এক জাগরণ-পুরুষ। তার কলমে বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য পেয়েছে বিদ্রোহের তেজ, আর বিদ্রোহ পেয়েছে নৈতিকতার ভিত্তি।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

[email protected]

কবি নজরুলইসলামসাম্য
    শেয়ার করুন:
    Advertisement
    রাজধানীর রাতের রাস্তা যেন পথচারীদের মৃত্যুফাঁদ

    রাজধানীর রাতের রাস্তা যেন পথচারীদের মৃত্যুফাঁদ

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৪

    হরমুজে নৌ-চলাচল চালু নিয়ে ইরান-ওমানের সমঝোতা

    হরমুজে নৌ-চলাচল চালু নিয়ে ইরান-ওমানের সমঝোতা

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৬

    ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব, বিভ্রান্ত ভক্তরা

    ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব, বিভ্রান্ত ভক্তরা

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৩

    নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ভিড়

    নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ভিড়

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৫

    পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলি, ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ গ্রেপ্তার

    পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলি, ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ গ্রেপ্তার

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৩

    নেপালে আবারও আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, সতর্কতা জারি

    নেপালে আবারও আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, সতর্কতা জারি

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩১

    নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, এখনো নিখোঁজ ৪০৩

    নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, এখনো নিখোঁজ ৪০৩

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৪

    পরিত্যক্ত ঘরে হাতবোমা বিস্ফোরণ, এলাকায় আতঙ্ক

    পরিত্যক্ত ঘরে হাতবোমা বিস্ফোরণ, এলাকায় আতঙ্ক

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০০

    নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মৃত অন্তত ৯৫

    নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মৃত অন্তত ৯৫

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ২২:৪৪

    জ্বালানি নিরাপত্তায় পারমাণবিক শক্তির ওপর গুরুত্ব বিজ্ঞানমন্ত্রীর

    জ্বালানি নিরাপত্তায় পারমাণবিক শক্তির ওপর গুরুত্ব বিজ্ঞানমন্ত্রীর

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৫

    রাবিতে আসনে বসা নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত ৪

    রাবিতে আসনে বসা নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত ৪

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৮

    রংপুরে চার খুন: মরদেহ পড়ে থাকা ছাদে আলামত নষ্টের অভিযোগ

    রংপুরে চার খুন: মরদেহ পড়ে থাকা ছাদে আলামত নষ্টের অভিযোগ

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:৫০

    নেপালে বন্যায় প্রাণহানিতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

    নেপালে বন্যায় প্রাণহানিতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৩

    এখনো নিখোঁজ ৫৭৯, নেপালে আকস্মিক এই বন্যার কারণ কী

    এখনো নিখোঁজ ৫৭৯, নেপালে আকস্মিক এই বন্যার কারণ কী

    ২৬ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩২

    ৯/১১ হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারীর’ বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ

    ৯/১১ হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারীর’ বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ

    ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৭

    advertiseadvertise