স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
- ইসলামে স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব

প্রতীকী ছবি
আল্লাহতাআলা মানুষকে তাঁর ইবাদত-বন্দেগির জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করতে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য। অসুস্থ ব্যক্তি যেমন দুনিয়াবি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না, তেমনি দ্বীনি দায়িত্বও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সুস্থতা রক্ষা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্বাস্থ্যবিধি বলতে এমন সব নিয়ম ও অভ্যাসকে বোঝায়, যা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং রোগপ্রতিরোধে সহায়তা করে।
স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রথম ধাপ হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ইসলাম ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচ্ছন্নতাকে মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য (ফিতরাত) হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দশটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত...’ এর মধ্যে রয়েছে গোঁফ ছোট করা, দাড়ি রাখা, মিসওয়াক করা, নখ কাটা, বগল ও লজ্জাস্থানের অপ্রয়োজনীয় লোম অপসারণ, নাকে পানি দেওয়া, ইস্তিঞ্জা করা এবং কুলি করা। (মুসলিম, হাদিস : ২৬১) শরীর, পোশাক ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখলে রোগজীবাণুর বিস্তার কমে এবং সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে।
হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যনীতি। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তু হালাল করেছেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তু হারাম করেছেন।’ (সুরা আ'রাফ, আয়াত : ১৫৭) ইসলামে হালাল খাদ্য শুধু ইবাদতের বিষয় নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক সুস্থতারও অন্যতম ভিত্তি। তাই স্বাস্থ্যকর ও বৈধ খাদ্য গ্রহণ এবং ক্ষতিকর ও হারাম বস্তু থেকে বিরত থাকা একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বর্জন সুস্থ জীবনের অপরিহার্য শর্ত। মদ ও অন্যান্য মাদক মানুষের মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্রসহ পুরো শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনও ধ্বংস করে। তাই আল্লাহতাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো পরিহার কর, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা মায়েদাহ, আয়াত : ৯০)
ইসলাম পরিমিত খাদ্য গ্রহণের শিক্ষা দেয়। অতিভোজন হজমশক্তি নষ্ট করে এবং নানা রোগের কারণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য কয়েক লোকমাই যথেষ্ট, যাতে তার পিঠ সোজা থাকে। আর যদি বেশি খেতেই হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৪৯) অর্থাৎ ক্ষুধা নিয়ে খেতে বসা এবং পুরোপুরি পেট ভরে না খাওয়াই সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম মানুষের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ৯) ঘুম দেহ ও মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا অর্থাৎ ‘তোমার চোখেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস: ১১৫৩) অর্থাৎ ইবাদত, কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পরিচ্ছন্নতা, হালাল খাদ্য, মাদক বর্জন, পরিমিত আহার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মতো স্বাস্থ্যনীতি অনুসরণ করলে মানুষ শারীরিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে সুস্থ থাকে। ফলে সে দুনিয়ার দায়িত্বের পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদতও সুন্দরভাবে পালন করতে সক্ষম হয়। তাই ইসলামের নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী ঢাকা




