অধঃপতনের কারণ ও উত্তরণের উপায়

প্রতীকী ছবি
মানুষের ঈমানি জীবনে সব সময় একই রকম দৃঢ়তা থাকে না। কখনো আসে ইবাদতে প্রশান্তি, আবার কখনো ভর করে গাফিলতি ও দুর্বলতা । ইসলামী পরিভাষায় এই অবস্থায় পতিত হয়ে নেক আমল ও হেদায়াতের পথ থেকে সরে যাওয়াকে বলা হয় ইন্তিকাসাহ বা অধঃপতন। এটি হঠাৎ ঘটে না; বরং ছোট ছোট অবহেলা একসময় বড় বিপর্যয়ে রূপ নেয়।
অধঃপতনের শুরু হয় সাধারণত সুন্নতের প্রতি উদাসীনতা দিয়ে। এরপর ফরজ ইবাদতে শৈথিল্য আসে। ধীরে ধীরে মানুষ নির্জনে গোপন গুনাহে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় সেই পাপ তার চিন্তা, চরিত্র ও প্রকাশ্য জীবনেও প্রভাব ফেলে। তখন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসময় কথা বলত, সে-ই আবার সেই অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে শুরু করে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।’ (সুরা নূর, আয়াত : ২১)। শয়তান মানুষকে এক বারে নয়, ধাপে ধাপে পথভ্রষ্ট করে।
গোপন গুনাহ অধঃপতনের সবচেয়ে ভয়ংকর কারণগুলোর একটি। নির্জনে আল্লাহকে অমান্য করতে করতে মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তখন তাওবার অনুভূতি কমে আসে এবং পাপকে স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। তাই বাহ্যিক ধার্মিকতার পাশাপাশি একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও আল্লাহভীতি বজায় রাখা জরুরি।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ লাভ করার পর অধঃপতিত হয়, সে এমন এক কষ্টের জীবন যাপন করে, যেখানে না থাকে গাফিলদের মতো নিরুদ্বেগতা, আর না থাকে আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ।’ (মাদারিজুস সালিকীন, ১/২৬)। অর্থাৎ ঈমানের স্বাদ একবার পাওয়ার পর তা হারিয়ে ফেলা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণা।
ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি (রহ.) বলেছেন, ‘অধঃপতন রোগের চেয়েও কঠিন। তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকার জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করো এবং সৎ অবস্থার পর বিপথগামিতা থেকে আশ্রয় চাও।’ (লাতায়িফুল মা‘আরিফ, পৃ. ৩৯৯)।
তবে ইসলামের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক শিক্ষা হলো, অধঃপতন যত গভীরই হোক তাওবার দরজা কখনোই বন্ধ হয় না। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)। তাই ভুলের পর হতাশ না হয়ে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের স্বভাব হওয়া উচিত।
এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বারবার এ দোয়া করতেন, ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)। কারণ মানুষের অন্তর আল্লাহর ইচ্ছাতেই পরিবর্তিত হয়, আর অবিচল থাকার তাওফিকও তাঁরই দান।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ছোট ছোট গাফিলতিকেও গুরুত্ব দেওয়া, গোপন গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা এবং বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা। মনে রাখতে হবে, অধঃপতনের পথ যেমন ধীরে ধীরে শুরু হয়, তেমনি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথও একটি আন্তরিক তাওবা থেকেই শুরু হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




