গৃহকর্মীর সঙ্গে আচরণ: নবীজির সুন্নাহ ও আমাদের বাস্তবতা

প্রতীকী ছবি
মানুষের মর্যাদা তার অর্থ-সম্পদ, সামাজিক অবস্থান কিংবা পেশার ওপর নির্ভর করে না; বরং তার মানবিকতা ও তাকওয়াই প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি। অথচ আমাদের সমাজে গৃহকর্মীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে এই সত্য অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। যারা প্রতিদিন অন্যের ঘর পরিষ্কার করেন, রান্না করেন, শিশুর যত্ন নেন কিংবা পরিবারের নানা কাজে সহযোগিতা করেন, তাদের অনেকেই প্রাপ্য সম্মান, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ গৃহকর্মীদের সঙ্গে সদাচরণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
অধীনস্থ ও সেবাকর্মীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে শিখিয়েছেন। সাহাবি আনাস ইবনু মালিক (রা.) দীর্ঘ দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবা করেছেন। তিনি বলেন,
خَدَمْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ. وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ.
‘আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে উফ্ শব্দটিও বলেননি। কোনো কাজ করে ফেললে বলেননি, কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলে বলেননি, কেন করলে না?’ (বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮; মুসলিম, হাদিস: ২৩০৯)।
চিন্তা করা যায়, বর্তমান সমাজে একজন গৃহকর্মীর সামান্য ভুলের জন্য কত কঠিন কথা শুনতে হয়! অথচ নবীজি (সা.) দীর্ঘ দশ বছর সেবায় নিয়োজিত একজন মানুষের সঙ্গে কখনো রূঢ় আচরণ করেননি।
গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে রয়েছে, সে যেন তাকে তা-ই খাওয়ায়, যা সে নিজে খায় এবং তা-ই পরিধান করায়, যা সে নিজে পরিধান করে। আর তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজের দায়িত্ব দেবে না। যদি এমন দায়িত্ব দাও, তবে তাদের সহযোগিতা করবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৩০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৬১)।
এ হাদিসে শ্রমিকের খাদ্য, পোশাক, কাজের সামর্থ্য ও সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তুলে ধরা হয়েছে।
অথচ আমাদের বাস্তবতায় অনেক গৃহকর্মী নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করতে বাধ্য হন। তাদের বিশ্রাম, অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কখনো সামান্য ভুলে অপমান, গালিগালাজ, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। শিশু গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এমন নিষ্ঠুরতা আরও উদ্বেগজনক। মনে রাখতে হবে, কারও অসহায়ত্ব কিংবা আর্থিক দুর্বলতা তাকে অপমান করার অধিকার দেয় না।
ইসলাম ন্যায্য মজুরি প্রদানের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ
‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩)
অর্থাৎ শ্রমিকের পারিশ্রমিক পরিশোধে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়। নির্ধারিত মজুরি যথাসময়ে দেওয়া, ছুটি ও বিশ্রামের সুযোগ রাখা এবং অসুস্থতায় সহযোগিতা করাও মানবিক দায়িত্ব।
গৃহকর্মী আমাদের পরিবারের সদস্য না হলেও মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে। তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা, পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা আমাদের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণও ইবাদতের অংশ। যে ঘরে নামাজ-রোজার চর্চা আছে, সেই ঘরে গৃহকর্মীর প্রতি অবিচার থাকতে পারে না। নবীজির সুন্নাহ অনুসরণের দাবি তখনই সত্য হবে, যখন আমাদের ঘরের দুর্বল মানুষটিও আমাদের আচরণে সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিকতার স্বাদ পাবেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



