কাকে ছেড়ে কাকে রাখি দশা বিএনপির

বিএনপি লোগো
স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই সরগরম হচ্ছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। নির্দলীয় এই নির্বাচনে অংশ নিতে দলটির প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে একাধিক নেতার আগ্রহ আছে। তাই বিরোধী দলের সঙ্গে লড়াইয়ের আগে নিজেদের মধ্য থেকেই একজন করে প্রার্থী বেছে নেওয়াই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ— প্রায় প্রতিটি পদেই গড়ে তিন থেকে চারজন করে নেতা দলের সমর্থন পেতে মরিয়া। সেজন্যই বিএনপির অনেক নেতা বলছেন, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হতে পারে। এতে তৃণমূলে
অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে দলীয় ঐক্য ধরে রেখে প্রতিটি পদে একজন করে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী চূড়ান্ত করাকেই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে— এলাকায় জনপ্রিয়তা, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে হতে পারে— এমন আভাস পেয়ে তিন-চার মাস আগ থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। গতকাল সরকারও জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে ভোট আয়োজন শুরু হবে। এতে প্রার্থী বাছাই এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও গতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ করতে চান তারা। কেন্দ্রের নির্দেশনায় জেলা নেতারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক পটভূমি, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান এবং অতীতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা, ফলাফলসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করবেন। পরে সেই প্রতিবেদন ও কেন্দ্রের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে সাংগঠনিক সম্পাদকরা চূড়ান্ত সুপারিশ করবেন।
দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকবেন বা মতবিরোধ বেশি থাকবে, সেখানে জেলা ও উপজেলা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতারাও এ প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত থাকবেন।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে খুব শিগগির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় হবে। জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার ভিত্তিতে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। কোথাও অভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকলে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
দলীয় একটি সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের সমর্থনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হবে। আর উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে।
এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপির সমর্থন পেতে অন্তত ছয়জন নেতা সক্রিয় হয়েছেন। বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন এম এ কাইয়ূম, তাবিথ আউয়াল, মোস্তফা জামান, এবিএমএ রাজ্জাক ও এম কফিল উদ্দিন আহমেদ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম নয়। বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালামের পাশাপাশি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ইশরাক হোসেন, তানভীর আহমেদ রবিন, কাজী আবুল বাশার, আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং আফরোজা আব্বাস দলীয় সমর্থন পাওয়ার আশায় কাজ করছেন।
শুধু বড় শহর নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও একই চিত্র। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ১ নম্বর গোদাগাড়ী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির অন্তত তিনজন নেতা মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি এনামুল হক চয়ন, গোদাগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির তথ্য সম্পাদক শরিফ উদ্দিন এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা বকুল। আবার যশোরের কেশবপুর উপজেলার ৬ নম্বর সদর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন পেতে আগ্রহী অন্তত আটজন নেতা। তারা হলেন সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজাউদ্দৌলা নিজাম, সহসভাপতি কামাল হোসেন, উপজেলা বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সম্পাদক আবু নাঈম, সহ-কোষাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আজিজুর রহমান ও যুগ্ম আহ্বায়ক অহিদুর রহমান অন্তু। দেশে বর্তমানে ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির বেশি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয় থাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দলের নেতাদের বিশ্বাস, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হলেও শেষ পর্যন্ত সবাই দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। তাই একক প্রার্থী নির্ধারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বললেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি স্তরেই বিএনপির একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জ। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগোতে হবে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘সবদিক বিবেচনায় দলের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই সমর্থন দেওয়া হবে। প্রয়োজনে দলের বাইরের সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেও বিবেচনা করা হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা।’




