শেরে বাংলার জন্মদিন
বাংলার ইতিহাসের ‘অমর’ বাঘ

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক (২৬ অক্টোবর ১৮৭১–২৭ এপ্রিল ১৯৬২)। আঁকা- ফারজিন জামান খান
বিংশ শতাব্দীর বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আবুল কাশেম ফজলুল হক বা এ কে ফজলুল হকের নামটি উচ্চারণ করলেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ঝড় বয়ে যায় আমাদের মননে। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর— আবার তিনিই ছিলেন সেই মানুষ, যিনি বাংলার নিম্নবর্গের কৃষকের কাছে ‘ডাল-ভাতের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতিকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন তিনি। তার জীবন শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনী নয়; তা স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলার কৃষক সমাজের জাগরণ, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহাকাব্যিক দলিল।
প্রথম জেদ
শেরে বাংলার শৈশবের একটি জনশ্রুতি আছে। ১৮৭৬ সালের ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে তাঁর মা ভয়ে ছোট্ট ফজলুল হক ও তাঁর বোনের হাতে নাম-ঠিকানা লিখে একটি পাতিলে ভরে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন; ঝড় থামলে গ্রামের মানুষ তাদের উদ্ধার করে। এই ঘটনাটি তাঁর জীবনের শুরুতেই এক নাটকীয় গল্পের জন্ম দেয়। শৈশবে তিনি ছিলেন দারুণ ডানপিটে— সারাদিন নদীতে সাঁতার কাটা, গাছে উঠে নারকেল পাড়া, কিংবা পাঞ্জা আর হাডুডু খেলায় ব্যস্ত থাকতেন। কথিত আছে, একবার এক কাবুলিওয়ালা এসে সবাইকে পাঞ্জায় হারিয়ে তিরস্কার করছিল; খবর পেয়ে ছোট্ট ফজলুল হক তাকে এমন চ্যালেঞ্জ করলেন যে কাবুলিওয়ালার কব্জিই মুচড়ে গিয়েছিল তাঁর মুষ্টির চাপে। এই ডানপিটে ছেলেটির মাথায় ছিল জব্বর পড়াশোনার ধারও।
আবুল কাশেম ফজলুল হকের জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর, আজকের দিনে, ঝালকাঠি জেলার রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে। পৈতৃক ভিটা বরিশালের চাখার গ্রামে। পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ হক ছিলেন বরিশাল আদালতের একজন বিশিষ্ট দেওয়ানি ও ফৌজদারি উকিল, আর পিতামহ কাজী আকরাম আলী ছিলেন আরবি ও ফারসিতে দক্ষ পণ্ডিত এবং বরিশালের একজন প্রখ্যাত মুক্তার। এই শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেই তার মেধার বিকাশ ঘটে। বাড়িতে আরবি ও ফারসিতে সনাতন ইসলামি শিক্ষা গ্রহণ শেষে ১৮৯০ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৮৯২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ এবং ১৮৯৪ সালে রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিদ্যা— এই তিন বিষয়ে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, একই সঙ্গে তিনটি বিষয়ে অনার্স নিয়ে পাস করার ঘটনা তখনকার বাংলায় মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে প্রথম ছিল।
ইংরেজিতে এমএ শুরু করলেও এক বন্ধুর ঠাট্টা তাঁর ভেতরের জেদকে নাড়া দেয়—মুসলমান ছাত্ররা নাকি অঙ্কে মেধাবী নয়। এই কথা শুনে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, অঙ্কশাস্ত্রেই পরীক্ষা দেবেন। মাত্র ছয় মাস অঙ্ক পড়েই ১৮৯৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন—আর তখনকার বাংলায় গণিতে এমএ করা তিনিই প্রথম মুসলমান। এই ঘটনাটিই তাঁর জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা—প্রতিহিংসাকে জ্ঞানে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা যে এই বাংলার মানুষের আছে, তা যেন ঐ ঘটনায় তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন। এই জেদ ও অধ্যবসায়ের গুণটিই পরবর্তী জীবনে তাঁকে বারবার দুঃসাধ্য কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে।
আইনজীবী থেকে রাজনীতির মঞ্চে
শিক্ষা শেষে ১৮৯৭ সালে ‘ইউনিভার্সিটি ল কলেজ’ থেকে বিএল ডিগ্রি নিয়ে স্যার আশুতোষ মুখার্জীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯০০ সালে সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল কিংবদন্তিতুল্য—বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে, দেশীয় শব্দ ব্যবহার করে, আন্তরিকতা আর শ্লেষ জুড়ে তিনি আদালতকে এমনভাবে জমিয়ে তুলতেন যে বিচারপতিরাও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। কলকাতা হাইকোর্টে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর আইনচর্চা করেন। তাঁর বাগ্মিতা ও যুক্তি উপস্থাপনের ভঙ্গি ছিল এতটাই আকর্ষণীয় যে সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর মামলা শুনতে আদালতে ভিড় করত।
কিন্তু কোর্ট-কাচারির বাইরেও তাঁর মন পড়ে ছিল বাংলার কৃষকের কাছে। ১৯০৬ সালে সরকারি চাকরি নিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জামালপুর ও মাদারীপুরে কাজ করার সময় জমিদার ও মহাজনের নির্মম অত্যাচার তিনি নিজের চোখে দেখেন—এই অভিজ্ঞতাই তাঁর কৃষকবান্ধব রাজনীতির ভিত্তি গড়ে দেয়। জামালপুরে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধলে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় তা বন্ধ হয়। সরকারি চাকরির সীমাবদ্ধতা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে; তিনি উপলব্ধি করেন, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকে প্রান্তিক মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাই ১৯১১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে আবার কলকাতা হাইকোর্টে ফিরে আসেন।
রাজনীতির মঞ্চে তাঁর সাড়ম্বর প্রবেশ ১৯১৩ সালে—ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে, যখন তিনি তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রায়বাহাদুর কুমার মহেন্দ্রনাথ মিত্রকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি একই সঙ্গে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ, দুই দলেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯১৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, আবার ১৯১৭ সালে কংগ্রেসের যুগ্ম সম্পাদক এবং ১৯১৮-১৯১৯ সালে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনিই ইতিহাসের বিরল ব্যক্তি, যিনি একই সময়ে দুই দলের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯১৬ সালে তিনি লখনৌ চুক্তি প্রণয়নে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় স্বশাসনের দাবিতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। ১৯১৯ সালে অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত পাঞ্জাব তদন্ত কমিটিতে তিনি মতিলাল নেহরু ও চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। মজার তথ্য—১৯১৮-১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব। ১৯২০ সালে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজাফফর আহমদের সঙ্গে ‘নবযুগ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশেও যুক্ত ছিলেন; ব্রিটিশবিরোধী লেখার কারণে পত্রিকাটি কয়েকবার জব্দ হয়। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় তিনি কেবল পদোন্নতির রাজনীতি করেননি; বরং বুঝতে পারেন, বাংলার মুসলমান সমাজের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়।
কৃষক প্রজা পার্টি ও ইতিহাসের বাঁক
ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত রূপান্তর ঘটে কৃষক প্রজা পার্টি বা কেপিপির মাধ্যমে। ১৯২৯ সালে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি গঠনের মধ্য দিয়ে যে বীজ বোনা হয়েছিল, সেখান থেকেই ১৯৩৬ সালে জন্ম নেয় কেপিপি। দলটির স্লোগান ছিল— “লাঙল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার”; আর নির্বাচনী প্রচারের মূল কথা ছিল— “সবার জন্য ডাল ভাত”। কেপিপির কর্মসূচিতে ছিল বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, ঋণ সালিশি বোর্ড প্রতিষ্ঠা এবং সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি। ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমি নির্বাচিত হলে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করব।” এই প্রতিশ্রুতি তখনকার বাংলার কৃষক সমাজে এক বিশাল উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে পটুয়াখালী উত্তর আসনে ‘লাঙল’ প্রতীকে ফজলুল হক মুখোমুখি হন মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিনের। নাজিমুদ্দিন ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের উত্তরসূরি এবং বিশাল জমিদারির মালিক; অন্যদিকে হক সাহেব তখনও ওকালতি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই লড়াইটি ছিল কৃষক বনাম জমিদার, নিম্নবর্গ বনাম অভিজাততন্ত্রের প্রতীকী প্রতিহিংসার লড়াই। নির্বাচনী প্রচারে হক সাহেব তাঁর বিখ্যাত রসিকতার পরিচয় দেন। তিনি ভোটারদের বলেছিলেন, “আপনারা সবাই নাজিমুদ্দিন সাহেবের নির্বাচন কেন্দ্রে গিয়ে বিরিয়ানি-পোলাও খাবেন। তারপর আমার বাক্সে আপনার মূল্যবান ভোটটি দিয়ে আমার নির্বাচন কেন্দ্রে এসে পান-সুপারি খেয়ে বাড়ি যাবেন।” পটুয়াখালীর ভোটদাতারা তা-ই করেছিলেন। ফজলুল হক ১৩,০০০ ভোট পেয়ে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করেন, আর নাজিমুদ্দিন পেয়েছিলেন মাত্র ৫,০০০ ভোট—৭,০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজয়। কৃষক প্রজা পার্টি ৩৯টি আসন পেয়ে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, মুসলিম লীগ পায় ৩৮টি। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করতে বাধ্য হন। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেরে বাংলা। এই নির্বাচনী জয় কেবল একটি আসনের জয় ছিল না; এটি ছিল বাংলার কৃষক সমাজের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নীরবতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় রাজনৈতিক প্রত্যুত্তর।
প্রধানমন্ত্রীর আমল,জমিদারি ও কৃষক মুক্তির আইনি লড়াই
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফজলুল হকের আমল বাংলার কৃষক-শ্রমিকের জীবনে আইনি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের এক বিরল অধ্যায়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে কৃষকরা জমির ওপর তাদের অধিকার হারিয়ে ফেলেছিল; জমিদাররা যখন খুশি কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতেন এবং ইচ্ছেমতো খাজনা বাড়াতে পারতেন। খাজনা পরিশোধ না করতে পারলে নির্যাতন, ভিটেমাঠি থেকে উচ্ছেদ তো ছিলই। ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক প্রজাস্বত্ব আইনের ব্যাপক সংশোধন করেন। খাজনা বাকি থাকলেও আদালত বা যথাযথ কারণ ছাড়া জমিদাররা আর কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। পরবর্তী ১০ বছরের জন্য খাজনা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা হয়। আগে জমি হস্তান্তরের সময় জমিদারকে যে বিশাল অঙ্কের ‘সেলামি’ দিতে হতো, তা বাতিল করা হয়। ‘চাষী খাতক আইন’ সংশোধন করে ঋণ সালিশি বোর্ডকে শক্তিশালী করা হয়—এই বোর্ডই ঋণের জালে জর্জরিত কৃষককে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনে, প্রায় ৮০ কোটি টাকার মহাজনি ঋণ মওকুফ করা হয়। ‘মহাজনী আইন’ ও ‘দোকান কর্মচারী আইন’ প্রণয়ন করে মহাজন ও শ্রমজীবীর সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৩৮ সালে ‘ফ্লাউড কমিশন’ গঠন করে জমিদারি প্রথা বিলোপের যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান কম নয়—বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার বিল, মুসলিম এডুকেশনাল ফান্ড গঠন, ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রেবোন কলেজ, বেকার হোস্টেল, আদিনা কলেজ, হরগঙ্গা কলেজ—এসব প্রতিষ্ঠান তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে তিনি ‘দ্য বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নেপথ্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তাঁর এই কাজগুলো শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; প্রতিটি আইনের পেছনে ছিল কৃষকের ঘামে ভেজা মাটির গন্ধ। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলার সমস্যা কেবল ধর্মীয় বিভাজনে নয়, শ্রেণিগত শোষণে। তাই জমিদারি প্রথা ও মহাজনি শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর আইনি আক্রমণ ছিল বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
১৯৪৩-এর মন্বন্তর, লাহোর প্রস্তাব
কিন্তু শেরে বাংলার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট আসে ১৯৪৩ সালে—বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বার্মা থেকে চালের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফসলের ব্যর্থতা এবং ঔপনিবেশিক নীতির যুগপৎ ফলাফলে সৃষ্টি হওয়া এই দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ১৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে নানা ঐতিহাসিক নথিপত্রে প্রমাণ মেলে। ১৯৪৩ সালের শুরুতে ফজলুল হক সরকার খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন এবং ‘স্কর্চড আর্থ’ ও ‘ডিনায়াল’ নীতির মতো ব্রিটিশ নীতিগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামো এবং যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ তাঁর মন্ত্রিসভার অবসান ঘটে— ব্রিটিশ গভর্নর জন হারবার্ট তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে, দুর্ভিক্ষের জন্য ব্রিটিশ নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাই বেশি দায়ী ছিল; ফজলুল হকের সরকারকে ‘সুবিধাজনক বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছিল। তবে একটি স্বায়ত্তশাসিত বাংলার সরকারপ্রধান হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশনে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন কমিটির তৈরি খসড়ার ভিত্তিতে সংশোধিত প্রস্তাবটি সাধারণ অধিবেশনে উপস্থাপন করেন ফজলুল হক নিজেই। প্রস্তাবটিতে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল না; বলা হয়েছিল, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চলের মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’-এ সংগঠিত করা হবে, যেখানে গঠনকারী প্রতিটি ইউনিট হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম। পাঞ্জাববাসীরা তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘শের-ই-বঙ্গাল’ উপাধি দেয়—যা থেকেই ‘শেরে বাংলা’ বা বাংলার বাঘ নামের উৎপত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, এই লাহোর প্রস্তাবই পরবর্তীতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান এবং আরও পরে স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করে। কিন্তু পরে যখন দেখলেন এই প্রস্তাবকে বিকৃত করে এককেন্দ্রিক পাকিস্তানের দিকে নেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে, তিনি কখনো অন্ধ দলীয় আনুগত্যে বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং তাঁর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল বাংলার মানুষের স্বার্থ।
দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট
দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় থিতু হন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি শুধু সমর্থনই করেননি—পুলিশের দমন-পীড়নে নিজে আহত হয়েছিলেন, ভাষা শহীদদের জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল; ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় এই হলেই। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীকে নিয়ে গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পায়; ১৫ মে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেরে বাংলা। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ঘোষণার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ৩১ মে ৯২(ক) ধারা জারি করে এই সরকার বাতিল করা হয়। এরপর ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর—১৯৫৮ সালের ১ এপ্রিল পদ থেকে অপসারণ পর্যন্ত তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় প্রমাণ করে, পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরেও তিনি বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
রাজনীতির বাইরে ফজলুল হকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক ছিল এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৩৭ সালে পাটকল শ্রমিকদের মজুরি ও কাজের পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন চলছিল; রবীন্দ্রনাথ শ্রমিকদের পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিলেন এবং ফজলুল হকের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের আবেদন জানিয়েছিলেন। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের ছবিতে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ হাতে চায়ের কাপ ধরে আছেন আর ফজলুল হক তাঁর দিকে ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ যেদিন ফজলুল হকের সঙ্গে দেখা করেন, সেদিনই বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁসের সূচনা হয়েছিল।” এই সাক্ষাতের ছবিতেই ধরা পড়ে—রাজনীতি ও সাহিত্য, চিন্তা ও কর্মের এক বিরল মিলন। এই ঘটনা বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্যের মধ্যকার গভীর আন্তঃসম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
উত্তরাধিকার
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিনবার বিয়ে করেন—প্রথম স্ত্রী খুরশিদ তালাত বেগম (নবাব আবদুল লতিফের নাতনি), দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুন্নিসা বেগম এবং তৃতীয় স্ত্রী খাদিজা বেগম। তাঁর একমাত্র পুত্র এ. কে. ফয়জুল হক পরবর্তীতে অধ্যাপক ও লেখক হিসেবে পরিচিত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ফজলুল হক ইংরেজি, আরবি, বাংলা, উর্দু ও ফারসি—এই পাঁচটি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। এই বহুভাষিক দক্ষতাই তাঁকে কলকাতার আদালত থেকে লাহোরের রাজনৈতিক মঞ্চ পর্যন্ত সর্বত্র গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় ৮৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁকে সমাহিত করা হয়—যেখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবরও রয়েছে; আজ যা ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত। তাঁর স্মরণে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শের-এ-বাংলা নগর, শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল, বুয়েট ও কুয়েটের শেরে বাংলা হল—অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন, “ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। সেই সঙ্গে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান।” যে মানুষটি মাত্র ছয় মাস অঙ্ক পড়ে গণিতের এমএ-তে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন, যিনি একই সঙ্গে মুসলিম লীগ আর কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ছিলেন, যিনি জমিদারি উচ্ছেদের আইন করে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন, যিনি লাহোর প্রস্তাবের মতো ঐতিহাসিক দলিল নিজ হাতে উত্থাপন করেও বাংলার বিভাজন ঠেকাতে প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন, যিনি ভাষা আন্দোলনে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছিলেন—সেই মানুষটির জীবন থেকে বাংলার রাজনীতি ও সমাজ আজও শিক্ষা নিতে পারে। নিতে পারে অনুপ্রেরণা।









