নাহিদ ইসলাম
‘ছয় মাসে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ, এক বছর পার হলে আন্দোলন’

ছয় মাসে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ, এক বছর পার হলে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
আজ সোমবার রাজধানীতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের গত ১৮০ দিনের সার্বিক কর্মকাণ্ড ও ব্যর্থতার চিত্র জাতির সামনে উপস্থাপন করার সময় এ ঘোষণা দেন নাহিদ।
দলটির পলিসি ও রিসার্চ বিষয়ক উপকমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সরকার পরিচালনায় নানা খাতের পর্যবেক্ষণ ও বিশদ তথ্য তুলে ধরা হয়।
এনসিপির শীর্ষ এ নেতা বলেছেন, ‘ক্ষমতার ৬ মাসে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আরও ৬ মাস সময় সরকারকে দিচ্ছি। এক বছর পার হলে আমরা জনসাধারণের সঙ্গে আন্দোলনে নামব।’
সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ বলেছেন, বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বিভিন্ন খাতে সামগ্রিক ব্যর্থতার একটি দীর্ঘ তালিকা উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সংকট ও রেকর্ড লোডশেডিং। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতি বাতিল করা এবং হাম রোগের ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার পাশাপাশি ব্যাংক দখল ও বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারেনি সরকার।
‘এছাড়াও বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, এবং জুলাই আন্দোলনের আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল করে দুর্বল আইন প্রণয়ন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং জনরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মতো বিষয়গুলো সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।’
বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়নেও পিছিয়ে ছিল না সরকার, অভিযোগ এনসিপির আহ্বায়কের। তিনি বলেছেন, ক্ষমতা গ্রহণের ১৮০ দিনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের ওপর দমনপীড়নের তীব্র অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা-কবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া ঝিনাইদহে পুলিশের উপস্থিতিতেই ছাত্রদল ও যুবদল কর্তৃক এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৭ জন আহত হন এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজাসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। হবিগঞ্জে 'জুলাই পদযাত্রা' শেষে এনসিপি নেতাকর্মীদের গাড়িতে হামলায় চোখ হারিয়েছেন ছাত্রশক্তির সংগঠক আলিফ চৌধুরী। অন্যদিকে, হবিগঞ্জের ঘটনার প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে আয়োজিত এনসিপির বিক্ষোভ মিছিলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।
জ্বালানি খাতের সংকট ও উৎপাদন বিপর্যয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ বলেছেন, জ্বালানি খাতে সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম চরম সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে দেশের পাম্পগুলোতে তীব্র পেট্রোল ও ডিজেল সংকট দেখা দেয় এবং রেকর্ড পরিমাণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানী ঢাকার মতো বড় শহরেও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা রান্নার চুলা জ্বলছে না। এই গ্যাস সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে; দেশের অন্যতম শিল্প হাব হবিগঞ্জের ১৭১টি কারখানা এবং নারায়ণগঞ্জের প্রায় ৪৫০টি ডাইয়িং কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ সামগ্রিকভাবে নেমে এসেছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুটে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও চাঁদাবাজি নিয়ে কথা বলেছেন নাহিদ। তিনি বলেছেন, নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে এবং দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এই সময়ে সারাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে অন্তত ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে আহত হয়েছেন ২,৯৭৪ জন। এছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০০টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০০ জনেরও বেশি নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে ৪০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন আরও ১৩৪ জন।
গত ৬ মাসে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম নৈরাজ্যকর ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক দখল, মেগা প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ ও নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়েও কথা বলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাতসহ নেতারা।






